সকাল ৭:৪৬ - বুধবার - ২৭শে মে, ২০২০ ইং - ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ - ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

ভারতে আম্পানের আঘাত, বাংলাদেশে বিপদ সংকেত বাড়ানো হয়েছে, আশ্রয় কেন্দ্রে মানুষ

লোক লোকান্তরঃ  ইতিমধ্যে ভারতের উড়িষ্যায় ‘সুপার সাইক্লোন’ আম্পানের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় আম্পানের আশঙ্কায় বাংলাদেশের মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সকালেই ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। এবার আবহাওয়া অধিদফতরের এক বিশেষ বুলেটিনে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে আগের ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের পরিবর্তে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে ঠাই নিয়েছে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ।

 

আবহাওয়া অধিদফতরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিম-মধ্য বঙ্গোপসাগর এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় ‘আম্পান’ উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বর্তমানে একই এলাকায় অবস্থান করছে।

 

ঘূর্ণিঝড়টি বুধবার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৫২৫ কিলোমিটার, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৫১৫ কিলোমিটার, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৪৫ কিলোমিটার এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৭০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল। এটি আরও উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে আজ বিকেল বা সন্ধ্যার মধ্যে সুন্দরবনের কাছ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

 

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বাধিক গতিবেগ ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

 

 

এর আগে বুধবার সকালে আবহাওয়া অধিদফতরের বুলেটিনে মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরসমূহকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়। এটি সর্বোচ্চ সতর্ক সংকেত।

 

উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং এসব এলাকার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

 

এ ছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে এর পরিবর্তে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

 

ঘূর্ণিঝড় ও দ্বিতীয় পক্ষের চাঁদের সময়ের শেষ দিনের প্রভাবে উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও চট্টগ্রাম এবং এসব এলাকার অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ১০ থেকে ১৫ ফুট বেশি উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

 

 

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

 

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের প্রথম আঘাত ভারতের উড়িষ্যায়

 

ভারতের উড়িষ্যায় উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় আম্পানের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। সেখানে প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাস বইছে এবং ভারি বর্ষণ হচ্ছে।ঝড়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্থাপনা ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

 

দেশটির জনপ্রিয় সংবাদ মাধ্যম দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার সকাল থেকেই উড়িষ্যার পারাদ্বীপে সর্বোচ্চ ১০৬ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। চান্দবালিতে ঘণ্টায় ৭৫ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে যায়।বেলাশোরে ৫৭ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে গেছে।আর ভুবনেশ্বরে ৫৬ কিলোমিটার বেগে ঝড় বয়ে গেছে।মুষলধারে বৃষ্টিপাতও হচ্ছে।দুপুর ও বিকালের দিকে এই ঝড় আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

 

প্রচণ্ড ঝড়ে গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি উপড়ে পড়েছে। কিছু কিছু জায়গায় গাছ পড়ে সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিদ্যুৎ সরবরাহের অবকাঠামো।

 

এদিকে ভারতের আবহাওয়া অফিসের বরাত দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম এই সময় জানায়, সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করেছে। বেলা বাড়লেই শুরু হবে তাণ্ডব। ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানতে পারে বিকাল বা সন্ধ্যা নাগাদ।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সুন্দরবনের কাছ দিয়ে উপকূলে উঠে আসার সময় আম্পান ঝড়ের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৮৫ কিলোমিটার হতে পারে।

 

আশ্রয় কেন্দ্রে ১০ লাখেরও বেশি মানুষ

 

ঘূর্ণিঝড় ‘আম্ফান’ বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে নিয়ে আসা হচ্ছে। বুধবার (২০ মে) সকাল পর্যন্ত ১০ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় কেন্দ্রে এসেছেন। বিকেল পর্যন্ত মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনা হবে। বুধবার সকালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. শাহ কামাল এ সব তথ্য জানান।

 

 

প্রবল ঘূর্ণিঝড় আজ বুধবার বিকেল বা সন্ধ্যা নাগাদ বাংলাদেশের উপকূল অতিক্রম শুরু করতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

 

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেন, ‘লোকজন আশ্রয় কেন্দ্রে আসতেছে। ১০ লাখের বেশি লোক আশ্রয় কেন্দ্রে চলে এসেছে। ঘূর্ণিঝড়টি সন্ধ্যা নাগাদ আমাদের উপকূল অতিক্রম শুরু করতে পারে। এ বছর স্কুল, কলেজসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুালোকেও আশ্রয় কেন্দ্র করা হয়েছে। এখন তো বাড়ির পাশেই স্কুল, বিকেল পর্যন্ত তো লোকজন আসতে থাকবেই। আমরা চাইছি ঝুঁকিপূর্ণ ২০ লাখের মতো মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনতে।’

 

তিনি বলেন, ‘সাতক্ষীরায় আশ্রয় কেন্দ্রে এসেছে ৩ লাখ ৫৩ হাজার, পটুয়াখালীতে এসেছে ৩ লাখ ২৩ হাজার। খুলনা ও পটুয়াখালীর যে এলাকাগুলো বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, সেই এলাকাগুলোর আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে বেশি লোক আসছে।’

 

‘আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা হচ্ছে। খাবার-দাবারের ব্যবস্থা করা আছে।’

 

আশ্রয় কেন্দ্র ১২ হাজার ৭৮টি থেকে বাড়িয়ে ১৩ হাজার ২১৫টি করা হয়েছে বলেও জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব।

 

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী ঘূর্ণিঝড় আম্ফান মোংলা বন্দর থেকে ৩৭০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এটি এখন পর্যন্ত শক্তিশালী। তবে রোদ থাকাটা ক্ষতিকর, তবে বৃদ্ধি হলে এটি দুর্বল হয়। গতকাল বৃষ্টি হলেও এই মুহূর্তে উপকূলীয় এলাকায় তেমন বৃষ্টি নেই।’

 

শাহ কামাল বলেন, ‘আম্ফান যদি সন্ধ্যার মধ্যে উপকূল অতিক্রম শুরু করে তবে আশ্রয় কেন্দ্রে আসা মানুষ হয়তো কাল সকাল থেকে বাড়ি ফিরতে পারবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।’

 

ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৮৫ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘন্টায় ২০০ কিলোমিটার যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ২২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।

 

মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরসমূহকে ৭ নম্বর বিপদ সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, ভোলা, বরিশাল, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

 

এছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার সমুদ্র বন্দরকে ৬ নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম এবং কক্সবাজার তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলো ৬ নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদফতর।

 

পথে কিছুটা দেরি হলেই ভয়াবহ বিপদের মুখে পড়ে যেতে পারে উপকূলীয় এলাকা। বড়সড় পরীক্ষার সামনে পড়বে সুন্দরবনের বাঁধ। কারণ, রাত পৌনে ৯টার সময় সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছবে জোয়ার।

 

ফাইল ছবি

সর্বশেষ আপডেটঃ ১:৩৫ অপরাহ্ণ | মে ২০, ২০২০