|

অনিয়ম দূর্নীতিতে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিস : আবেদনকারীরা ভোগান্তিতে

স্টাফ রিপোর্টারঃ  অনিয়ম দূর্নীতির কারনে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিস আজ স্থবির হয়ে পড়েছে। অসহায় বিদেশগামী ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া রোগীসহ জন সাধারনের ভোগান্তি এখন চরমে। জমা দেয়া ফাইলের স্তুপে প্রতিটি কক্ষ পরিপূর্ণ। বিগত কর্মকর্তাকে দোষারোপ করে কাজের গতি মন্থর বলে জানায় কর্তৃপক্ষ। ভোগান্তির শিকার এ সকল পাসপোর্টের আবেদনকারীদের মতে, অযোগ্য, অদক্ষ, দায়িত্বহীন অফিসার সহকারি পরিচালক গাজী মাহামুদুল হাসানের কারণেই আজ এ ভোগান্তি।

 

সরেজমিনে ঘুরে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসর্পোট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের নারী-পূরুষের ভিড় অফিসে। তবে সকলের মুখে এক অশান্তির ছাপ। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গলায় পরিচয় পত্র ঝুলছে দেখেই তাদের চেনা যায়। এ ছাড়া দোতলায় কর্মকর্তাদের কক্ষে কিছু বাড়তি বহিরাগত লোক রয়েছেন যারা জমা আবেদন ফাইল ডেসপাস করছে। তাদের কাজ নিয়ে কথা বলতে গেলে তাঁরা মুহুর্তে সরে যায়। তবে তারা অফিসের কেউ নয়। আফজাল, মোস্তাক, আতিক ও শাহীনরা ছোটা চুক্তিতে নিয়ম বহির্ভুতভাবে কাজ করে বলেও অনেকে দাবী করেন।

সাংবাদিক দেখে পাসপোর্ট আবেদনকারী ভালুকার রফিক জানান, তিনি ৩ মাস আগে পাসপোর্টের জন্য আবেদন জমা দিয়েছেন। সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে আবেদন জমা দেয়। ব্যাংক চালানের বাড়তি অফিসের খরচ দিয়েও সে এখনো পাসর্পোট পায়নি। যে পাসর্পোট পাওয়ার কথা ২৫ দিন বা এক মাসের মধ্যে। বিদেশে চাকুরি নিয়ে সংসারের হাল ধরার আশায় বাবার ধানি জমি বিক্রি করে বিদেশে যাবেন বলে দাবী করেন এই রফিক। সংসারে সুখ আসবে এমন প্রত্যয়ে সে বিদেশ যাওয়ার জন্য পাসর্পোট আবেদন করে। কবে পাসর্পোট পাবে তাও অনিশ্চিত। মানসিকভাবে বির্পযস্থ হয়ে বিসন্নতায় হতাশ। মোবাইল ফোনে ম্যাসেজ পেয়েছে তাঁর পাসর্পোট হয়ে গেছে। এর পর প্রায় প্রতিদিনই অফিসে আসে তার পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে। কখনো বই আসেনি। আবার কখনো কর্মকর্তা নেই বা ঝামেলা আছে বলে তাকে কয়েকদফা ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

 

জটিল রোগে আক্রান্ত বিভাগীয় শহরের আমলাপাড়ার শরৎ ভট্টাচার্য। উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি ভারতে যাবে। আবেদন জমা দিয়েছেন প্রায় দু’মাস আগে। তারও মোবাইলে ম্যাসেজ এসেছে কয়েকদিন আগে। এখনো পাসর্পোট হাতে পায়নি। পাসর্পোট হাতে পাওয়ার পর ভিসার আবেদন করবে। হতাশায় আরো বেশি অসুস্থ্য হয়ে পড়ছে। পরিবারের আশংকা পাসর্পোট হাতে আসার আগেই তার মৃত্যু হয় কিনা।

 

একজন কানাডা প্রবাসি। নাগরিকত্বও পেয়েছেন। গত বছর দেশে এসে বিয়ে করেছেন। স্ত্রীর পাসর্পোট আবেদন করেছেন দু’মাস আগে। স্ত্রী সন্তান সম্ভবা। পরিবারের ইচ্ছা সন্তান ভুমিষ্ঠ হোক কানাডায়। কিন্তু পাসপোর্ট জটিলতায় পড়েছেন ভোগান্তীতে। আক্ষেপ করে ঐ প্রবাসী বলেন, সাধারণ মানুষ কেন এমন ভোগান্তীতে পড়ে যা পৃথীবির অন্য কোন দেশে নেই। যার যা কাজ তা যদি সঠিকভাবে করতো তাহলে এদেশের মানুষের কোন সমস্যা সৃষ্টি হতো না।

 

এ সব জানার পর সাংবাদিক প্রতিনিধি দল সোজা উপরে গেলেন, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক গাজী মহমুদুল হাসানের কক্ষে ঢুকে পড়েন। ঢুকতেই দেখা মেলে, ঐ কর্মকর্তার অফিসিয়াল টেবিল ও মেঝে হাজার হাজার পাসপোর্ট আবেনকারীর ফাইলের স্তুপ। কেন এত আবেদন এলোমেলো অবস্থায় স্তুপাকারে পরে আছে জানতে চাইলে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেন। পরবর্তীতে তিনি বলেন, আগের কর্মকর্তা আবেদনের ফাইলগুলোতে জটিলতা করে গেছেন। সেই জটিলতা ঠিক করতেই এ সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া লোকবলের অভাব রয়েছে। পাসর্পোট আবেদন জমা, যাচাই, পুলিশ প্রতিবেদন পাঠানোসহ সকল কাজ তাকেই করতে হচ্ছে বলেই তিনি দাবী করেন। অনিয়ম, দূর্ণীতি ও ভোগান্তির বিষয়ে কথা হলে তিনি বলেন, কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে ঠিক। তিনি আরো বলেন, আমি প্রতিদিনের আবেদন পরদিনই পাঠিয়ে দিচ্ছি।

গাজী মাহামুদুল হাসান

    ছবিঃ সহকারি পরিচালক গাজী মাহামুদুল হাসান

অফিসে ঘুরে খোজ নিয়ে আরো জানা গেছে, ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বর্তমান সহকারী পরিচালক অযোগ্য, অদক্ষ ও দায়িত্বজ্ঞানহীন। তিনি কাজ বুঝেন না বলেই তাদের দাবী। এ সহকারী পরিচালক কাজ না বুঝেই কখনো আবেদন জমা নিতে অন্যদের সরিয়ে দিয়ে নিজেই নিচ্ছেন। আবার কখনো পাসপোর্ট বিতরণ করছেন নিজেই। পাসপোর্ট অফিসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আমরা যাচাই বাছাই করে প্রতিদিন আবেদন জমা নিচ্ছি। তিনি বলেন, সারা দেশে রোহিঙ্গা সৃষ্টি হলেও ময়মনসিংহে কোন রোহিঙ্গা ধরা পড়েনি। রোহিঙ্গা পাসপোর্ট হয়নি। এরপরও শতভাগ যাচাই বাছাই করে আবেদন জমা নিচ্ছি। তার মতে, এ সকল আবেদনকারীদের আবেদন ফরম প্রতিদিনই সহকারী পরিচালক ঢাকায় পাঠানোর কথা রয়েছে। অতীতে এ নিয়মেই অফিসটি চলত। কিন্তু বর্তমান সহকারী পরিচালক যোগদানের পর সকল নিয়ম বাদ দিয়ে নতুন নিয়ম চালু করেছেন। শতভাগ যাচাই করে আবেদন জমা নেওয়ার পরও তিনি নানা অজুহাতে গুটি কয়েক আবেদন ঢাকায় পাঠাচ্ছেন। এতে প্রতিদিনই ঢাকায় না পাঠানো আবেদন এই অফিসের কর্তার টেবিলসহ আশপাশ মেঝেতে স্তুপাকারে পড়ে থাকছে। তবে এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, আমি প্রতিদিনের আবেদন পরদিন ঢাকায় পাঠাচ্ছি। তিনি আরো বলেন, স্তুপাকারে পড়ে থাকা সবই আগের কর্মকর্তার আমলের আবেদন। এগুলোও ঢাকায় পাঠাব তবে যাচাই বাছাইশেষে।

 

এদিকে, পাসপোর্ট বিতরণ কক্ষে গিয়ে দেখা যায় ২০/২৫ হাজার পাসপোর্ট র‌্যাগ, আলমারীসহ টেবিলের উপরে সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে। পাসপোর্টধারীরা তাদের পাসপোর্ট নিতে আসলে বিতরণ কক্ষ থেকে প্রকাশ্য বলে দেওয়া হচ্ছে, সহকারী পরিচালক আসলে তিনি নিজে যাচাই করে প্সাপোর্ট প্রদান করবেন। আবার ঐ কর্মকর্তাদের কাছে বাড়তি কিছু টাকাসহ রিসিট দিলে অল্প সময়েই পাসপোর্ট পেয়ে যাচ্ছেন অনেকেই।

 

অপর এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতিদিন প্রায় ৩/৪ শত পাসপোর্ট বই প্রিন্টশেষে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ অফিসে আসছে। পাসপোর্ট সংগ্রহে পাসপোর্টধারীদের ভোগান্তি একটি সৃষ্ট ভোগান্তি। এই কর্মকর্তার আগের কর্মকর্তাগণ প্রিন্টিংশেষে পাসপোর্ট ময়মনসিংহ অফিসে আসার পর কর্মকর্তাগণ একটিভ করে বিতরণ করে কক্ষে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন। এতে পাসপোর্টধারীরা বিতরণ কক্ষে এসে যে কোন সময় তাদের পাসপোর্ট কোন ধরণের ভোগান্তি ছাড়াই নিতে পারতেন। সুত্রটির মতে, বর্তমান সহকারী পচিালক পাসপোর্ট প্রিন্টিংশেষে ময়মনসিংহে আসার পর আবারো তদন্তের নামে একটি একটি করে নিজে একটিভশেষে বিতরণ করছেন। আবার বিতরণ কক্ষে সহকারী পরিচালক না থাকায় ঐ কক্ষ থেকে বলে দেওয়া হচ্ছে সহকারী পরিচালক নেই বই পরে নিতে হবে। এভাবে প্রতিদিন প্রায় শতাধিক পাসপোর্টধারী রিসিট সহকারে এসে ঐ কর্মকর্তােেক না পেয়ে পাসপোর্ট ছাড়াই ফেরত যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে পাসপোর্টধারী মারাত্বকভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আবার অনৈতিক সুবিধা ও অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্ট সহকারী পরিচালকের স্বাক্ষর ছাড়াই এ সব পাসপোর্ট প্রদান করছেন একাধিক কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে সহকারী পরিচালক বলেন, পাসপোর্ট হলেও সঠিক লোক তাদের বই পাচ্ছে কিনা তা করতেই তিনি একটি একটি করে বই বিতরণ করছেন। তবে অনেকেই অর্থের বিনিময়ে পাসপোর্ট দিচ্ছেন এ সম্পর্কে তিনি কোন মন্তব্য করতে রাজি নয়।

 

 

অফিসের কর্মরত দুই আনসার সদস্য পাসপোর্টের জন্য আবেদন করতে আসা লোকজনের সাথে খারাপ ব্যবহারসহ নানা ধরণের অশুভ আচরণ করে আসছেন। তাদেরকে কিছু বললে তারা বলেন, টাকা দিয়ে বদলি হয়ে এসেছি। অভিযোগ করে আমাদের কিছুই করতে পারবেন না।

সর্বশেষ আপডেটঃ ১১:২৯ অপরাহ্ণ | অক্টোবর ১৯, ২০১৯