|

আমির খসরু ও সংগীত

ফকির শাহ্ সাইফুল আলম পান্নু :
১২৫৩ খৃষ্টাব্দে পাতিয়ালায় জন্ম গ্রহণ করেন। উপমহাদেশের সঙ্গীতের ইতিহাসে আমির খসরুর অবদান চিরস্মরণীয়। আমির খসরুর পিতার নাম সাইফুদ্দিন লাচিন। প্রথম জীবনে খোরাসান বাসী ছিলেন। সেখানে যুদ্ধের কারণে ভারতে চলে আসেন তিনি পরবর্তীতে সুলতান ইলতুটমিশের দিল­ীর দরবারে নিজেকে অধিষ্ঠিত করেন। এমদাদুল মুল্ক এর কন্যাকে তিনি বিবাহ করেন। ১২৬৪ খৃষ্টাব্দে খসরুর পিতা মৃত্যুবরণ করেন, পিতার মৃত্যুর পূর্বেই পিতার নিকট ও পরে মাতামহের নিকট বিদ্যা শিক্ষ শুরু করেন। শৈশব কাল থেকেই তার মাঝে সর্ব বিষয়েই অসাধারণ প্রতিভা লক্ষ্য করা যায়। ছোট থেকেই খসরু তুর্কী, ফার্সী, আরবী, উর্দু, হিন্দী, বৃজ ভাষা চর্চা শুরু করেন। কাব্য রচনায় তার অনুরাগই বেশী পরিলক্ষিত হয়। বিভিন্ন ভাষা ছাড়াও খসরু বিজ্ঞান ও দর্শন আয়ত্ব করতে থাকেন। মাত্র ১২ বৎসর বয়সের মধ্যেই বেশ ক’টি কবিতা লিখে ফেলেন। দিল­ীর দরবারের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে তিনি তখনকার সঙ্গীত চর্চার উচ্চু মার্গের পরিবেশের সংস্পর্শে চলে আসেন ও সঙ্গীতের প্রতি ঝুঁকে পড়েন। দিল­ীর দরবারে সুবাদে আরো দুটি বিষয়ে “রাজনীতি ও যুক্তিবিদ্যায়” পারদর্শী হয়ে ওঠেন। খসরু দরবার জীবনের সাথে জড়িয়ে পড়েন ও নিজ গুনে বিভিন্ন সময়ে দরবারের উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত থাকেন। পরবর্তীতে খসরু ২৫ বৎসর বয়সে মালিক ছর্জুর দরবারে উ”চপদে দু’ বৎসর থাকার পর বলবনের দ্বিতীয় পুত্র নাসিরুদ্দীনের দরবারে চলে আসেন। পর্যায়ক্রমে বলবনের জৈষ্ঠ্যপুত্র মুহম্মদের দরবারে আসেন, মুহম্মদের দরবারে সাহিত্য, সঙ্গীত চর্চা চলছিল প্রবলভাবে। খসরু তখন সামরিক পদেও দরবারে সগৌরবে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সেই সময় মঙ্গলদের সাথে যুদ্ধে খসরু বন্দী হন। প্রাণ হারায় মুহম্মদ। সৌভাগ্যক্রমে খসরু বন্দী দশা থেকে কিছুদিন পরে মুক্তি পান। তখন তিনি জন্মস্থান পাতিয়ালায় চলে যান। পরে আবার তিনি চলে আসেন দিল­ীতে কায়কোবাদের দরবারে, পরে জালাল উদ্দিন খিলজির দরবারে বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার সঙ্গে অধিষ্ঠিত হন। জালাল উদ্দিন খসরুর গুনগ্রাহী ছিলেন। তার দরবারেই খসরুকে ‘আমির’ উপাধী দান করা হয়। তার সঙ্গীত সভা ছিল খুবই জমজমাট। খসরু ছিলেন তার মধ্যমনি। ১২৯৬ খৃষ্টাব্দে আলাউদ্দিন খিলজী আরোহন করেন সিংহাসনে ও খসরুকে বিশেষ মর্যাদায় দরবারে বরণ করে নেন। আলাউদ্দিন খিলজীর রাজত্বকালেই আমির খসরুর প্রতিভার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটে। আলাউদ্দিন খিলজীর পর কুতুবউদ্দিন মোবারক শাহ সিংহাসনে বসলে আমির খসরু তার দরবারেও বিশেষ জ্ঞান লাভ করেন। পরবর্তী সম্রাট গিয়াস উদ্দিন তুঘলকের দরবারেও খসরু সগৌরবে অধিষ্ঠিত হন। আমির খসরুর দীর্ঘ জীবন নানা রাজনৈতিক উত্থান পতনের ভিতরে অতিবাহিত হয়। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কোন সাধনাই তিনি দীর্ঘদিন চালাতে পারেন নি। তথাপি অসাধারণ প্রতিভা ও নিষ্ঠার, বলে অসাধ্য সাধন করেছেন তিনি। অল্প বয়সেই মরমী সাধক নিজামুদ্দিন আউলিয়ার শিষ্যত্ব গ্রহণের মাধ্যমে সংস্পর্শে আসেন। গুরুর প্রভাব খসরুর মানব জীবনকে সারাজীবন ঘিরে রেখেছিল ও সৃজনশীল কাজে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। আমির খসরু ছিলেন কবি, প্রাবন্ধিক, রাজনীতিক, ঐতিহাসিক, দার্শনিক, সঙ্গীতজ্ঞ, গীতিকার, সুরকার, মরমী সাধক, যুক্তিবিদ্যা বিশারদ ও অন্যন্য গবেষক। তার লিখিত গ্রন্থের সংখ্যা ৯৯টির মধ্যে ৩০ খানি বই আজোও পাওয়া যায়। তিনি বৃজ ভাষাকে পরিমার্জিত ও সমৃদ্ধ করেছিলেন, সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য আমির খসরু বিখ্যাত হয়ে আছেন। তিনিই সর্বপ্রথম কার্যকর ভাবে ভারতীয় সঙ্গীত পদ্ধতির সম্মিলন ঘটান। তিনি নতুন রাগ, নতুন গীত পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। নতুন তাল ও বাদ্যযন্ত্র সৃষ্টি করেন। পারসী সুর মিশ্রনে ১২টি রাগের স্রষ্টা আমির খসরু। ইমন, সাজুগিরি, জিলফ প্রভৃতি উলে­খযোগ্য। ইমন বসন্ত, ইমন পুড়িয়া, ইমন ভূপালী, ইমন বিলাবল, ইমন বেহাগ, ইমন কল্যাণ প্রভৃতি রাগ আমির খসরুর সৃষ্টি। ভারতীয় তুর্কী পারস্য সঙ্গীতের মিশ্রনে নতুন দিগন্ত উন্মেচন করে অনেক সুন্দর সুন্দর রচনা করেছেন আমির খসরু। যার ফলে অসংখ্য রাগ ও গায়নের সৃষ্টি হয়েছে। বৃদ্ধি করেছিলেন বিকৃত স্বর প্রযুক্ত করে মূর্ছনার সংখ্যা। ফলে সপ্তক ও ঠাট সম্পর্কে নতুন ধারনার উন্নেষ ঘটে। আমির খসরুকে কাওয়ালীর প্রবর্তক বলা হয়। খেয়াল বিকাশে কাওয়ালীর অবদান অসামান্য। আমির খসরুর কাওয়ালী পদ্ধতি খেয়ালের বিকাশে আদি অবদান রেখেছে। এ ব্যাপারে কোন সংশয় নেই। তারানা, গুল্নকস্, সহলা প্রভৃতি গীতরীতির প্রবর্তন করেছেন আমির খসরু। খামসা, যৎ, সওয়ারী, ফরদো পহলওয়ালন প্রভৃতি তাল আমির খসরুর সৃষ্টি। যন্ত্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রেও অসামান্য অবদান এই আমির খসরুর। তিনি সেতার যন্ত্রের উদ্ভাবক। সেতারে যৎ ও তোরার প্রবর্তনও তিনি করেন। ঢোল ও তবলা প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রও আমির খসরুর উদ্ভাবিত। নানা বিঘœসংকুল জীবনে আমির খসরুর বহুমুখী অবদান বিস্ময় সৃষ্টি করে। তাঁর তুলনা বিরল সাঙ্গীতিক বিষয় সংযোজনে তিনি ভারতীয় সঙ্গীতে যে কালোত্তীর্ণ পরিবর্তন সূচিত করেছিলেন তার জন্য তার প্রাপ্য প্রশংসা সমকাল থেকে আজো পর্যন্ত অবারিত রয়েছে। ঐতিহাসিকের কেউ কেউ বলেছেন, “অতুলনীয় আমির খসরু তাঁর মত ব্যক্তি পূর্বেও ছিলেন না, শেষ বিচারের আগে পর্যন্ত আসারও সম্ভাবনা নেই”। ১৩২৫ খৃষ্টাব্দে বাহাত্তর বছর বয়সে আমির খসরু শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। লেখক: শিল্পী, সংগঠক, গবেষক, সমাজসেবক

সর্বশেষ আপডেটঃ ১:১৪ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৯