|

ময়মনসিংহে হকার্স মার্কেটের ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত, ঘটনার জন্য দায়ি কে?

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ  ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র গাঙ্গিনারপাড় হকার্স মার্কেটের আগুনে দুই শতাধিক দোকানপাট পুড়ে প্রায় শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঈদের আগেভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ব্যবসায়ীরা পথে বসে গেছে। দুই দফা আগুন ছড়িয়ে পরা, পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, কথিত লীজের নামে প্রভাবশালীদের পুকুর দখল, মার্কেটে আগুন নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকা কোনটি দায়ি আজকের ঘটনার জন্য?

 

বৃহস্পতিবার সকালে এ আগুনের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট দীর্ঘ চেষ্ঠা করে দুপুর ২টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। ভয়াবহ আগুনের খবর পেয়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, এডিশনাল ডিআইজি, ডিসি, এসপি, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, পৌর মেয়রসহ র‌্যাব-পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে।

 

আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন থাকে পুরো গাঙ্গিনারপাড় জুড়ে। প্রাথমিকভাবে আগুনে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় শত কোটি টাকা হবে বলে ব্যবসায়ীদের ধারণা।অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নায়িরুজ্জামানকে প্রধান করে আট সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত শেষে তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন জেলা প্রশাসক।

 

ময়মনসিংহ শহরের প্রাণকেন্দ্র গাঙ্গিনারপাড় হকার্স মার্কেটে ভোরের দিকে আকস্মিক আগুনের লেলিহান দেখতে পায় স্থানীয়রা। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করে। পরে ত্রিশাল, ঈশ্বরগঞ্জ, মুক্তাগাছা ও ফুলবাড়িয়া থেকে ফায়ার সার্ভিসের আরো ৪টি ইউনিট এসে যোগ দেয়। আগুন আতংকে হকার্স মার্কেট সংলগ্ন ও আশপাশের প্রায় শতাধিক দোকানপাঠের দোকানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও লুটপাট পর্যন্ত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

হকার্স মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আবদুল হক জানান, আগুনে হকার্স মার্কেটের সব দোকানপাট ও মালামাল পুড়ে গেছে। ঈদ সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ঋণ করে, চড়া সুদে টাকা নিয়ে লাভের আশায় প্রতিটি দোকানে ঈদসামগ্রী তুলেন। সব হারিয়ে তারা নিঃস্ব।

 

জুতা ব্যবসায়ী হৃদয় জানান, তাদের পরিবারের আয়ের একমাত্র উৎস এ জুতার দোকান। আগুনে সব পুড়ে গেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, এর আগে এত বেশি দোকানপাটে আগুন লাগার খবর তারা শোনেননি। দীর্ঘ সময়েও আগুন নিয়ন্ত্রণে না আসায় একদিকে যেমন ক্ষোভ অন্যদিকে শহরের পানীয়জলের অন্যতম মাধ্যম সরকারী পুকুর বেআইনীভাবে কথিত ইজারার নামে ভরাট হওয়ায় হতাশা দেখা গেছে শহরবাসীর মাঝে।

 

শহরবাসী জানান, সকাল ৬টার দিকে আগুনের সুত্রপাত হলেও দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট।

শহরবাসীর মতে, ফায়ার সার্ভিসের আটটি ইউনিট আগুনের স্থলে উপস্থিত হলেও পানির অভাবে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ না করে বেকার বসে হা হুতাশ করেছে।

 

শহরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র গাঙ্গিনারপাড়, স্টেশন রোড এলাকায় কোনো জলাধার নেই। বেশ কয়েকটি পুকুর থাকলেও তা কথিত লীজের নামে জবর দখলে নিয়ে প্রভাবশালীরা প্রশাসনের সহায়তায় ভরাট করে ফেলেছে। শহরের একমাত্র পানির উৎস্য বিদ্যাময়ী স্কুলের পুকুর আগুনের স্থল থেকে দূরে হলেও অবশেষে ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট সেখান থেকে পানি নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।

 

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের উপ পরিচালক শহীদুুর রহমান জানান, পানি সমস্যার কারণে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রচণ্ড বেগ পেতে হয়। শহরের একমাত্র জলাধার বিদ্যাময়ী স্কুলের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নেভানো হয়।

বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুন লাগতে পারে বলে এ কর্মকর্তা প্রাথমিকভাবে ধারণা করেন।

 

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আল আমিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণসহ আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও লুটপাটসহ সকল ধরণের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে কাজ করে। কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মাহমুদুল ইসলাম জানান, আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসায় ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতিরোধে আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থাকায় কোন ধরণের লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি।

 

জেলা প্রশাসক ড. সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস জানান, মার্কেটের প্রায় দুই শতাধিক দোকান পুড়ে গেছে।আগুন আতংকে এছাড়াও বেশ কিছু দোকাপাটের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিভিন্ন সংস্থা ক্ষতি নিরুপণে কাজ করছে।

 

এর আগে আগুনে হকার্স মার্কেট পুড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে বিভাগীয় কমিশণার জিএম সালেহ উদ্দিন, ডিআইজি নিবাস চন্দ্র মাঝি, জেলা প্রশাসক ডঃ সুভাষ চন্দ্র বিশ্বাস, পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম, জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এডভোকেট জহিরুল হক, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইউসুফ খান পাঠান, পৌর মেয়র ইকরামূল হক টিটু আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

এ সময় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা পানির সল্পতার জন্য অলম বসে রয়েছে, কোথায় পানি পাওয়া যাবে তা নিয়ে হা হুতাশ করছে, অবশেষে বিদ্যাময়ী স্কুলের পুকুর থেকে পানি এনে আগুন নিভানো হয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পানির অভাবে অনেক ক্ষতি হয়েছে। সময়মতো চাহিদা পরিমান পানি পাওয়া গেলে অনেক আগেই আগুন নিভানো সম্ভব হতো। এতে ক্ষতির পরিমাণ অনেক কমে আসত।

 

এদিকে দ্বিতীদফায় আগুনে হকার্স মার্কেট সংলগ্ন লোটো ও বস ট্রেইলার্সে আগুন ধরে গেলে ব্যাপক ক্ষতি হয়। এ সময় পানি না পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিককর্মী, শহরবাসী, নারী পুরুষ বিভিন্ন বাসাবাড়ি দোকানপাঠ থেকে বোতলে করে পানি নিয়ে আগুন নিভানো চেষ্ঠা করে।

 

এদিকে ফায়ার সার্ভিস শহরে পানি না পাওয়ায় আগুন নিভাতে দেরী এবং অনেক বেশী ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় প্রশাসন ক্ষোভের মুখে পড়ে। এক পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার, ডিআইজি, ডিসি, এসপিসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ শহরের আমলা পাড়ায় সরকারী ইজারা লব্দ ভরাট করে ফেলা শেরপুকুর পরিদর্শন করেন।

উল্লেখ্য, আমলা পাড়ায় সরকারী বিশাল শেরপুকুর ইজারা নিয়ে প্রশাসনের সহায়তায় শহরের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী তার ভরাট করে বাড়ি বানানোর চেষ্ঠা করছে। এ নিয়ে অনেক লেখালেখি করলেও প্রশাসন তার দিকে চোখ দেয়নি।

 

অবশেষে পানি না পেয়ে বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে বিশাল টিম সরে জমিনে পরিদর্শন করেন।

 

ছবিঃ লোক লোকান্তর

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৭:৩৪ অপরাহ্ণ | জুন ০৭, ২০১৮