|

প্রধানমন্ত্রীর কাছে শিক্ষকদের খোলা চিঠি

লোক লোকান্তরঃ  নিজেদের মনের কস্ট, আক্ষেপ, বঞ্চনা ও অসহায়ত্বের কথা উল্লেখ করে বিশ্ব মানবতার মা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে বাংলাদেশ সরকারী মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতির পক্ষে রবিবার (২২ এপ্রিল) সকালে খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন সমিতির যুগ্ম আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলী বেলাল।

 

খোলা চিঠিটি প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছবে কিনা তা নিয়েও শংকিত এ শিক্ষক নেতা। পাঠকদের সুবিধার্থে পুরো খোলা চিঠিটি হুবহুব তুলে ধরা হলো।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমরা গভীরভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের মনের কষ্ট ও বেদনা আপনার সমুদ্রসম বিশাল হৃদয়ে আমাদের প্রতি সমবেদনার ঢেউয়ের গর্জন তুলবে। আমরা সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ছয় হাজার শিক্ষক যাদেরকে আপনি ২০১২ সালের ১৫ মে একই বেতনক্রমে অর্থাৎ আমাদের এন্ট্রিপদ ১০ম গ্রেডে রেখেই দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দিয়েছিলেন। যদিও আমরা দাবি করেছিলাম প্রথম শ্রেণি (নবম গ্রেড)। আপনি যখন দ্বিতীয় শ্রেণি ঘোষণা করেছেন তখন আমরা খুশিতে নেচেছিলাম।

 

কারন তখন আমরা বুঝতে পারিনি এই দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা পেয়ে আমরা আর্থিকভাবে মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন হবো। মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে জীবন যাত্রার মান উন্নত করতে হয়। আর তা করতে হলে দৈনন্দিন জীবনের খরচ বেড়ে যায়। এজন্য মর্যাদা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেতন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ার কথা। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আমাদের বেতন বৃদ্ধি না পেয়ে উল্টো প্রতি মাসে আমরা সাত থেকে দশ হাজার টাকা বেতন কম পাচ্ছি।

 

কারণ আমাদের তৃতীয় শ্রেণি থাকলে বিধিমোতাবেক ২০১৫ সালের পে-স্কেল ঘোষণার পূর্বে যাদের চাকরির মেয়াদ আট বছর পূর্ণ হয়েছে তারা প্রথম টাইমস্কেল, ১২ বছরে দ্বিতীয় টাইমস্কেল এবং ১৫ বছরে তৃতীয় টাইমস্কেল পেয়ে যথাক্রমে নবম, অস্টম ও সপ্তম গ্রেডের আর্থিক সুবিধা ভোগ করতে পারতাম। কিন্তু দ্বিতীয় শ্রেণি ঘোষণার ফলে আমরা না পাচ্ছি তৃতীয় শ্রেণির আর্থিক সুবিধা, না পাচ্ছি দ্বিতীয় শ্রেণির আর্থিক সুবিধা। আমরা সবাই পূর্বের গ্রেডেই অবস্থান করছি।

 

যেহেতু বেতনক্রমের পরিবর্তন না করে আমাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেয়া হয়েছে এবং আমাদের দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা দেয়ার সময় কোন শর্তারোপ করা হয়নি। আমাদের তৃতীয় শ্রেণির আর্থিক সুবিধাবলী হ্রাস পেলে মেনে নিতে হবে।

 

সেহেতু আমাদের মৌলিক এবং নৈতিক অধিকার দ্বিতীয় শ্রেণির আর্থিক সুবিধাবলী ভোগ করা অর্থাৎ আমাদের মধ্যে যাদের চাকরির মেয়াদ চার বছর হয়েছে তাদেরকে সিলেকশন গ্রেড, যাদের আট বছর হয়েছে তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণি হিসেবে প্রথম টাইমস্কেল মানে অস্টম গ্রেড এবং যাদের ১২ বছর হয়েছে তাদেরকে দ্বিতীয় টাইমস্কেল মানে সপ্তম গ্রেড পাওয়া।

 

এভাবে আমাদেরকে দেয়া না হলে আমরা কখনই সপ্তম গ্রেডে যেতে পারবো না, যা আমাদের প্রায় ২৫শ’ সহকারী শিক্ষক একই নিয়োগবিধিতে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়ে সপ্তম গ্রেডের আর্থিক সুবিধাবলী ভোগ করতেছেন। এখন যদি আমাদের অনুরুপ দেয়া না হয় তাহলে তাদের মধ্যে ও আমাদের মধ্যে আর্থিক বৈষম্যের সৃষ্টি হবে, যা আমাদের মহান সংবিধান অনুমোদন করেনা। এখানে সমতা বিধান করার জন্য আপনার নিকট আমাদের বিনীত প্রার্থনা।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমি প্রথমেই আমাদেরকে হতভাগ্য বলে উল্লেখ করেছি। এর দুটি কারণ। প্রথমত: মর্যাদা পেয়েও আমরা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। দ্বিতীয়ত: আমরা সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকগণ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাগণের আমাদের প্রতি তাদের বিমাতাসুলভ আচরণের কারণে ৩০ থেকে ৩৫ বছর চাকরি করেও আমরা কোন প্রমোশন পাইনা।

 

বছরের পর বছর আমাদের প্রমোশনের পদগুলো খালি থাকে। আমাদের প্রায় ৯৫% শিক্ষক সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করে সহকারী শিক্ষক হিসেবেই অবসরে যান। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে মাধ্যমিক স্তরে সিনিয়র শিক্ষক পদ সৃজন করে নবম গ্রেডের মর্যাদা দিয়ে মাধ্যমিক স্তরে এক অভুতপূর্ব এবং যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যা মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি এবং তা করার জন্য আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ।

 

এর ফলে আমাদের সকল শিক্ষকের জীবনে অন্তত একটি প্রমোশন পাওয়ার নিশ্চিত সুযোগ সৃষ্টি হলো। এজন্য আমরা আপনাকে আমৃত্যু শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবো কিন্তু দুর্ভাগ্য, সিনিয়র শিক্ষক পদে সহকারী শিক্ষকদের পদায়নের দৃশ্যমান কোন অগ্রগতি হচ্ছে না। পক্ষান্তরে সরকারী কলেজে প্রমোশনের পদ খালি না থাকলেও তাদের প্রমোশন দিয়ে দেয়া হয়। পরবর্তীতে যখন পদ খালি হয় তখন সেখানে তারা যোগদান করেন। এ ছাড়া আমাদের প্রতি তাদের বিমাতাসুলভ আচরনের জ¦লন্ত উদাহরণ হলো বে-সরকারী কলেজ যখন আত্মীকরণ করা হয়, তখন প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপাল পদের ব্যক্তিগণকে লেকচারার পদে আত্মীকৃত করা হয়।

 

অপরদিকে বে-সরকারী মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো যখন আত্মীকরণ করা হয়, তখন প্রধানশিক্ষক ও সহকারী প্রধানশিক্ষকগণ স্ব-পদেই বহাল থাকেন। ফলে বে-সরকারী কলেজ ও বে-সরকারী মাধ্যমিক স্কুল আত্মীকরণ বিধিমালা স্পষ্টত ডাবল স্টান্ডার্ড হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে আমরা কলেজে শিক্ষকদের ন্যায় সমান সুযোগ পাইনা।

 

কারণ বে-সরকারী স্কুলের প্রধানশিক্ষক ও সহকারী প্রধানশিক্ষক স্বপদে বহাল না রাখার বিধান রাখা হলে আমরা সরকারী কলেজ শিক্ষকদের ন্যায় প্রমোশনের সমান সুযোগ পেতাম। এ ছাড়া বে-সরকারী স্কুলের প্রধানশিক্ষক ও সহকারী প্রধানশিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষার সময় সরকারী হাইস্কুলের প্রধানশিক্ষকগণ অনেক সময় সাবজেক্ট এক্সপার্ট হিসেবে আমাদের (সহকারী শিক্ষক) নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

 

আমাদের প্রায় সকল সহকারী শিক্ষক বেতন-ভাতাদি তাদের চেয়ে বেশী পাই। যে কারণে আমরা সুযোগ পেয়েও বে-সরকারী স্কুলের প্রধানশিক্ষক পদে যোগদান করিনি। এখন তারাই যদি আমাদের কর্মকর্তা হন তাহলে বিষয়টা বেমানান দেখায়। ফলে আমরাও বিসিএস কলেজ শিক্ষকদের ন্যায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হবো।

 

সরকারী কলেজের শিক্ষকগণ যে দৃষ্টিকোণ থেকে নো বিসিএস, নো ক্যাডার শ্লোগানে বে-সরকারী কলেজ শিক্ষকদের নন ক্যাডার ও লেকচারার পদে আত্মীকরণ করার আন্দোলন করেন, আমরাও একই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে, নো ডাইরেক্ট রিক্রুটমেন্ট, নো সিনিয়রিটি শ্লোগানকে যৌক্তিক মনে করছি। সুতরাং এটা আমাদের নৈতিক অধিকার। আমাদের দাবি একই অধিদপ্তরের অধীন আত্মীকরণ বিধিমালা অভিন্ন হতে হবে। এর জন্য আপনার (প্রধানমন্ত্রী) সদয় দৃষ্টি কামনা করছি।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, স্বদেশ থেকে বিতারিত ১০ লাখ রোহিঙ্গাদের ক্ষুধার্ত, ভীত-সন্ত্রস্ত ও নির্যাতিত মুখচ্ছবি আপনার হৃদয়ে তাদের প্রতি সমবেদনার ঢেউ তুলেছে। ফলে আপনি মানবতার মা হয়ে সমগ্র বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে তাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করে বিশ্বনেতা হিসেবে বাংলাদেশের মান বিশ্ব দরবারে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তাই আপনি সমগ্র বিশ্বের মানবতার জননী খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা যখন কোটা সংস্কার আন্দোলনরত, তখন তাদের রৌদ্রে পোড়া ক্লান্ত মুখছবি এবং এর ফলে সৃষ্ট যানজটের কারণে ঢাকাবাসীর দুর্ভোগ আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যায়, আপনি মূহুর্তের মধ্যে তাদের দাবি মেনে নিয়ে ক্লাসে ফিরিয়ে দিয়েছেন।

 

আপনি জাতির জনকের কন্যা, আপনি বার বার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতিতে সা¤্রাজ্যবাদী প্রভু রাষ্ট্রগুলো এ দেশের তথাকথিত বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার মাধ্যমে আমাদের দেশে যে রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি চালু করেছিল যার উদ্দেশ্য ছিল আমাদের দেশের অগ্রযাত্রাকে রুখে দেয়া, আমাদেরকে চিরতরে গরীব রাষ্ট্র বানিয়ে রাখা। সব কিছুকে পিছু ঠেলে তা আপনি কঠোর হস্তে দমন করেছেন।

 

অর্থাৎ তারা কুটকৌশলে এ দেশের জনগণের মাথায় এই ধারনা ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল যে, এক সরকার বার বার আসেনা। একবার আওয়ামী লীগ পরেব বার অন্যদল। এখানেই গভীর ষড়যন্ত্রটা লুকায়িত ছিলো। কারণ যে সরকার ভালো করবে তাকে পুণরায় ক্ষমতায় আনতে হবে। তা না করা হলে ভালোর মূল্যায়ণ করা হবেনা।

 

আর ভালোর মূল্যায়ণ করা না হলে পরবর্তীতে যারা ক্ষমতায় আসবে তারা স্বাভাবিকভাবেই ভাববে আওয়ামী লীগ এতোভালো করেও ক্ষমতায় আসতে পারেনি। সুতরাং আমরা ভালও করেও পুণরায় আসতে পারবোনা। যা পারি হাতিয়ে নেই। এই অপসংস্কৃতি ভেঙ্গে দিয়ে আপনি প্রমাণ করেছেন যে, সরকারের ধারাবাহিকতা দেশের জন্য এবং দেশের জন্যগণের জন্য কল্যাণকর।

 

আপনি বাংলাদেশের সকল বঞ্চিত শ্রেণির আস্থার প্রতীক। আপনার কাছ থেকে এযাবৎকাল পর্যন্ত কেউ খালি হাতে ফিরেনি। সেই আপনার কাছেই আমাদের বঞ্চনার কথা তুলে ধরছি। আশা করি আপনার সমুদ্রসম বিশাল হৃদয়ে আমাদের প্রতি সমবেদনার ঢেউয়ের গর্জনে ভেসে যাবে আমাদের সকল বঞ্চনার ইতিহাস। আমরা ফিরে পাব আমাদের সকল মৌলিক ও নৈতিক অধিকার।

 

এটাই আপনার নিকট আমাদের একান্ত কামনা। আপনার সু-স্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও উত্তরোত্তর রাজনৈতিক সফলতা কামনা করছি।-মোহাম্মদ আলী বেলাল, যুগ্ম আহবায়ক, বাংলাদেশ সরকারী মাধ্যমিক সহকারী শিক্ষক সমিতি।

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:৫৪ পূর্বাহ্ণ | এপ্রিল ২৪, ২০১৮