|

এরা ডাক্তার না কসাই?

লোক লোকান্তরঃ  চট্টগ্রামে চরম দায়িত্ব অবহেলার পরিচয় দিয়েছেন চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের দায়িত্বশীল চিকিৎসকগণ। নিউমোনিয়া আক্রান্ত নবজাতক কন্যাশিশু নিয়ে চাইল্ড কেয়ারে ভর্তি হয়েছিলেন নোয়াখালীর রোখসানা (২১)। দুইদিন পর বলা হয় শিশুটি মারা গেছেন।

 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ শিশুর লাশ মোড়ানো প্যাকেট গছিয়ে দেয় মা রোখসানাকে। এরপর বার বার মুর্ছা যান রোখসানা। ঘরে নিয়ে জানাজার আগে প্যাকেট খুলে দেখেন ভেতরে লাশটি একটি ছেলে শিশুর। এরপর রাতেই নোয়াখালী থেকে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে শহরের পাঁচলাইশ থানায় এসে বিষয়টি খুলে বলেন রোখসানা।

 

ওই অভিযোগ শুনে উল্টো হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফাহিম রেজা রোখসানাকে শাসিয়ে বলেন, আপনি ‘ছেলে শিশুই জন্ম দিয়েছেন। রেজিস্টার ও ডেথ সার্টিফিকেটে ছেলেই লেখা আছে। আমাদের ভুল হওয়ার প্রশ্নই আসে না’ নিরব হয়ে যান, না হলে খবর আছে’।

 

ডা. ফাহিম রাতে এসব কথা বললেও ভোরে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের এনআইসিইউ’র বেড থেকে রোখসানার নবজাতক কন্যাশিশু উদ্ধার করে পাঁচলাইশ থানা পুলিশ।

 

গত মঙ্গলবার রাতে শহরের ট্রিটমেন্ট সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে এ ধরনের ঘটনাটি ঘটেছে।

 

রোখসানার দাবি, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তার কন্যা শিশুটিকে বিক্রি বা পাচারের উদ্দেশ্যে একটি মৃত শিশুর সাথে বদল করেছিলেন। এদিকে শহরের প্রবর্তক মোড়ে অবস্থিত বেসরকারি ‘চাইল্ড কেয়ার’ হাসপাতালে নবজাতক বদলে অপর এক শিশুর লাশ দেওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

 

একাধিক সূত্র জানায়, নোয়াখালীর গ্রামের বাড়িতে একটি কন্যা শিশুর জন্ম দেন গৃহবধূ রোখসানা। জন্মের ছয় ঘন্টা পর শিশুটিকে মাইজদী হাউজিং সেন্ট্রাল রোডের মা ও শিশু হাসপাতালের তিন নম্বর কেবিনে ভর্তি করানো হয়। নিউমোনিয়া আক্রান্ত নবজাতক কন্যা শিশুর উন্নত চিকিৎসার্থে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ১৪ এপ্রিল রাত দেড়টায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চলে আসেন তিনি।

 

এরপর শিশুটিকে চাইল্ডকেয়ার হাসাপতালের এনআইসিইউ’তে (নিউনেটাল ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট) ভর্তি করেন রোখসানা। তিনদিনের মাথায় ১৭ এপ্রিল বেলা দশটায় বলা হয়, রোখসানার শিশুটি মারা গেছেন। যথারীতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্যাকেট মুড়িয়ে লাশটি রোখসানার হাতে গছিয়ে দেয়। ঘরে ফিরে জানাজার আগে গোসল করাতে প্যাকেট খুলে দেখা যায় ভেতরে একটি ছেলে শিশুর লাশ।

 

১৭ এপ্রিল রাতেই রোখসানা একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে শিশুর লাশ নিয়ে হাজির হন পাঁচলাইশ থানায়। থানা পুলিশ বিষয়টি সাধারণ ডায়েরি হিসাবে নথিভুক্ত করেন।

 

গৃহবধূ রোখসানা বলেন, ওই শিশুর লাশ নিয়ে আমরা সারারাত এম্বুলেন্সে বসেছিলাম থানার সামনে। ভোর রাতে আমাকে জানানো হয়, আমার মেয়ে পাওয়া গেছে। আইসিইউতে পাশের সিটের শিশুর সঙ্গে বদল হয়েছে। সকালে একটি অ্যাম্বুলেন্স এসে ছেলেটির লাশ নিয়ে যায়, পরে আমার মেয়েকে চাইল্ড কেয়ার থেকে ফেরত দেয়া হয়।

 

এসব কথা বলতে বলতে কয়েক বার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি। বর্তমানে শিশুটিকে রয়েল হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হয়েছে। রোখসানা বলেন, চাইল্ড কেয়ার কর্তৃপক্ষ আমার কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়েছেন। আমার সঙ্গে যা হয়েছে তা যেন আর কোনো মায়ের সঙ্গে না হয়। এরা ডাক্তার না কসাই?

 

ওদের এনআইসিইউতে কোনো সিসি ক্যামেরা নেই। আমার ধারনা, তারা আমার সন্তানকে অন্য কোথাও বিক্রি বা পাচারের উদ্দেশ্যে রেখে দিয়েছিলো। যদি আমাকে অন্য কোনো কন্যার লাশ দেওয়া হতো আমি বুঝতেই পারতাম না। যেসব চিকিৎসক এ কাজে জড়িত তাদের কঠোর বিচার চাই। চাইল্ড কেয়ারে ভর্তি করানোর পর শেভরন ও ট্রিটমেন্টে পরীক্ষা করানো হয়। সেখানেও উল্লেখ আছে মেয়ে। হাসপাতালের রেজিস্টারে লেখা আছে মেয়ে। কিন্তু ডেথ সার্টিফিকেটে শুধু ছেলে লেখা ছিল।

 

যখন বাবুর লাশ প্যাকেট করে দেওয়া হয় তখন তারা বলেছিল, ‘মা যেন বাবুর চেহারা না দেখে। বাবুর মুখে রক্ত লেগে আছে। তা দেখলে হার্ট এ্যাটাক করতে পারে।’

 

রয়েল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. বিধান রায় চৌধুরী জানান, শিশুটি বেশ অসুস্থ। জন্মের পর ব্রেনে অক্সিজেন পৌঁছেনি। খিঁচুনি ও ইনফেকশন আছে। আমরা মেডিকেল বোর্ড গঠন করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।

 

গত বুধবার সকালে রোখসানার কাছে নবজাতক কন্যাশিশু ফেরত দিয়েছেন চাইল্ড কেয়ার কর্তৃপক্ষ অথচ মঙ্গলবার রাতে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালের পরিচালক ডা. ফাহিম হাসান রেজা বলেছিলেন, ‘ওই মা ছেলে সন্তানই জন্ম দিয়েছিলেন। রেজিস্টার ও ডেথ সার্টিফিকেটে ছেলে লেখা আছে। প্রতিটি শিশুর শরীরে ট্যাগ লাগানো থাকে। আমাদের ভুল হওয়ার কোন সুযোগ নেই।’

 

এদিকে শহরের প্রবর্তক মোড়ে অবস্থিত বেসরকারি ‘চাইল্ড কেয়ার’ হাসপাতালে নবজাতক বদলে অপর এক শিশুর লাশ দেওয়ার ঘটনায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছেন স্বাস্থ্য বিভাগ। ওই কমিটিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

 

বৃহস্পতিবার সিভিল সার্জন ডা. আজিজুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বেসরকারি ক্লিনিক পরিদর্শন কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. এএম মুজিবুল হক খানের নির্দেশে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 

আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার নাথকে আহ্বায়ক ও একই হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শাহ আলমকে সদস্যসচিব ও সিভিল সার্জন কার্যালয়ের কর্মকর্তা শাহেদুল ইসলামকে এই কমিটির সদস্য করা হয়েছে। তদন্ত কমিটি আগামি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।

সর্বশেষ আপডেটঃ ১১:২৮ পূর্বাহ্ণ | এপ্রিল ২০, ২০১৮