|

ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা নতুন রেলকোচে কি কি সুবিধা থাকছে?

লোক লোকান্তরঃ   ক্রমাগত বেড়েই চলেছে রেলপথের যাত্রী। এমন পরিস্থিতিতে অধিক যাত্রী পরিবহনে সর্বাধুনিক ও বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন যাত্রীবাহী রেলকোচ আমদানির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। চলতি বছরের মাঝামাঝিতেই ওসব রেলকোচ দেশে আনার কথা রয়েছে।

 

ব্রডগেজ ও মিটারগেজ উভয় ধরনের কোচই আমদানি করা হবে। তার মধ্যে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রথমবারের মতো ওসব রেলকোচে প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য নতুন ডিজাইনের বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন কোচও থাকবে।

 

তাছাড়া ওসব কোচে পৃথিবীর সকল উন্নত দেশের ট্রেনের মতো নানা সুবিধা থাকবে বলেও জানা যায়। রেলপথ মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, যাত্রী পরিবহনে কোচের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে আড়াইশ রেলকোচ আমদানি করছে। চলতি বছরের জুলাই মাসের শেষের দিকে ওসব রেলকোচ বাংলাদেশে আনা শুরু হবে। নতুন ওসব কোচ আনা হলে ট্রেন পরিচালনার জন্য দীর্ঘদিনের কোচ সংকট অনেকাংশে দূর হবে। আর তার মাধ্যমে অধিকসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।

 

তাছাড়া বর্তমানে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৭০ থেকে সর্বোচ্চ ৮০ কিলোমিটার থাকলেও ওসব কোচের কারণে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত হবে। তাতে রেলের গতি বাড়ার পাশাপাশি যাত্রীদের সময়ও সাশ্রয় হবে।

 

বাংলাদেশ রেলওয়ের মিটারগেজ ও ব্রডগেজ যাত্রীবাহী কোচ সংগ্রহ নামক প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩শ’ ৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ ২০১৯ সালের ৩০ জুন শেষ হবে। প্রকল্পের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচ কেনা হবে।

 

তাছাড়া প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য মোট দুটি অটোমেশিন ট্রেন ওয়াশিং ট্রিটমেন্ট প্লান্ট স্থাপন করা হবে। যার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আমদানিকৃত রেলকোচগুলোর মধ্যে ২০০টি মিটারগেজ কোচ কিনতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৫শ’ ৮০ কোটি টাকা ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচ কেনার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২শ’ ১৩ কোটি টাকা।

 

সূত্র জানায়, ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা নতুন কোচে বিশেষ সুবিধা সম্পন্ন বায়ো টয়লেট বা ভ্যাকুয়াম টয়লেট স্থাপন করা হবে। যা বাংলাদেশের কোনো ট্রেনে প্রথমবারের মতো সংযোজন করা হচ্ছে। ওসব টয়লেটে চওড়া দরজা তৈরি করা হবে। যাতে টয়লেটে সহজে হুইল চেয়ার নিয়ে প্রবেশ করা যায়।

 

কোচগুলোতে পুরনো মাইল্ডশিল্ড বডি বাদ দিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির দীর্ঘস্থায়ী স্টেইনলেস স্টিলের বডি থাকবে। তাছাড়া বর্তমান ব্রেক পদ্ধতির পরিবর্তে সম্পূর্ণ অটোমেটিক এয়ার ব্রেক সিস্টেম থাকবে। ফলে যে কোন ট্রেন যে কোন প্রয়োজনে অতি দ্রুত থামানো সম্ভব হবে। এমনকি অতি দ্রুততার সঙ্গে ট্রেন ছাড়াও সম্ভব হবে। ফলে সময়ও অনেক সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি সহজেই ট্রেনের গতি বৃদ্ধি পাবে।

 

কোচগুলোতে বর্তমান প্রযুক্তির বক্স সিস্টেমের এয়ারকন্ডিশনার বাদ দিয়ে উন্নতমানের ইয়ারকন্ডিশন রূপ মাউন্টেড এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম ব্যবস্থা থাকবে। প্রথম শ্রেণী বার্থ (কেবিন) বগিতে ভেতরে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকবে, দোতলায় উঠার জন্য উন্নত মানের সিঁড়ি তৈরি এবং পানি ও কাপ পিরিচ রাখার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

 

বর্তমানে রাতে সমস্ত বগিতে লাইট জ্বালানো থাকে। এর পরিবর্তে এলইডি লাইট দেয়া হবে। তাছাড়া গভীর রাতে প্রতিটি বগিতে মাত্র তিনটি বিশেষ প্রযুক্তির তিনটি ডিম লাইট জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হবে।

 

তাছাড়া ওসব কোচে প্রতিবন্ধীদের ট্রেনে উঠার জন্য প্রথমবারের মতো ট্রেনের দুপাশের শেষ প্রান্তের দুটি কোচে প্রশস্ত দরজা তৈরি করা হবে। যাতে প্রতিবন্ধীরা সহজেই হুইল চেয়ারে করে ট্রেনে উঠতে পারেন। ট্রেনকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করতে কোচের ভেতর দিক নির্দেশনাযুক্ত নির্দিষ্ট আসন ব্যবস্থা রাখা হবে।

 

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও অধিক ভোল্টের বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৩শ’ কিলোওয়াটের উন্নতমানের পাওয়ার কার থাকবে। প্রতিটি ট্রেনেই প্রেয়ার রুম থাকবে। প্রতিটি কোচের ভেতরে উন্নত বার্নিশের ইন্টেরিয়র জিজাইন করা হবে, যা দেখলে পরিবহন হিসেবে ট্রেনের প্রতি চলমান ধারণা পাল্টে দেবে।

 

আধুনিক সুবিধা সম্পন্ন ওসব ট্রেনের কোচগুলো রাইডংইনডেক্স থাকবে ২ দশমিক ৫। ফলে চলন্ত অবস্থায় কোচগুলো তেমন একটা নড়চড় করতে পারবে না। ফলে যাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক হবে। তাছাড়াও যাত্রী আকর্ষণে প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের জন্য আরামদায়ক ও স্বাস্থ্যসম্মত আসনসহ প্রয়োজনীয় সকল প্রকার ব্যবস্থা থাকবে। প্রকল্পে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল জোনের জন্য ২টি অটোমেটিক ট্রেন ওয়াশিং প্লান্ট কেনা হবে। যার মাধ্যমে ট্রেন ওয়াশ করা অনেক সহজ হবে।

 

সূত্র আরো জানায়, একটি কোচ থেকে অন্য কোচে যেতে বর্তমান পদ্ধতির দরজার পরিবর্তে স্লাইডিং ডোর সংযোজন করা হবে। ফলে ট্রেনের ভেতরের পথে চলাচল অনেক সহজ হবে। যে কোন প্রকার ট্রেন দুর্ঘটনা রোধে বর্তমানের একটি কোচের সঙ্গে অন্য কোচের সংযুক্ত রাখতে চেইনের পরিবর্তে সেমি অটোমেটিক সিবিসি কাপলার ব্যবস্থা রাখা হবে। যা ট্রেন দুর্ঘটনা কমাতে সাহায্য করবে।

 

তাছাড়া প্রথমবারের মতো টিউবলার এন্টি টেলিস্কোপিক ডিজাইনের বডি তৈরি করা হচ্ছে। ফলে যে কোন দুর্ঘটনায় কোচ উল্টে গেলেও কোচ দুমড়ে-মুচড়ে যাবে না। ফলে কোচের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমবে।

 

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন জানান, যাত্রীচাহিদার তুলনায় চলমান কোচের সংকট নিরসনে ও রেলকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দ্রুত গতিসম্পন্ন ব্রডগেজ ও মিটারগেজ মোট ২শ’ ৫০টি কোচ আমদানি করা হচ্ছে।

 

রেল মন্ত্রণালয়ের এই প্রকল্পটির বাস্তবায়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩শ’ ৭৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ইন্দোনেশিয়া থেকে আনা ওসব আধুনিক কোচ হবে দেশে প্রথমবারের মতো কোন প্রতিবন্ধীবান্ধব কোচ। ওসব কোচে প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্দিষ্ট আসন সংরক্ষিত থাকবে ও সহজেই ওঠানামা করাসহ হুইল চেয়ারে টয়লেটে যাওয়ারও বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে। ভেতরে স্লাইডিং ডোরের ও অটোমেটিক এয়ারব্রেক সিস্টেমের ওসব ট্রেনের গতি থাকবে ঘণ্টায় ১০০ থেকে ১শ’ ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে যাতায়াতে অনেক সময় সাশ্রয় হবে।

 

টিউবলার এন্টি টেলিস্কোপিক ডিজাইনের স্টেইনলেস স্টিলের বডির তৈরি এসব কোচে কোন দুর্ঘটনা ঘটলেও কোচ দুমড়ে-মুচড়ে যাবে না। ফলে সামান্য সংস্কার করেই পুনরায় ওসব কোচ ব্যবহার করা হবে। তাছাড়া প্রথমবারের মতো পরিবেশ রক্ষায় আমরা ট্রেনে ভ্যাকুয়াম টয়লেট স্থাপন করা হবে।

 

চুক্তি অনুযায়ী আগামী জুলাই মাসের শেষ নাগাদ ওসব কোচ আসা শুরু হবে। ওসব কোচ চলার সময় বর্তমানে তুলনায় অনেক কম নড়াচড়া করবে। মোটকথা এসব কোচ হবে যাত্রীবান্ধব।

 

ছবিঃ প্রতীকী

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:৪৯ পূর্বাহ্ণ | এপ্রিল ২০, ২০১৮