|

ময়মনসিংহে কঙ্কল চুরির হিড়িক, ২৭টি কবরে নেই কঙ্কাল

সাজ্জাতুল ইসলাম সাজ্জাত, গৌরীপুর (ময়মনসিংহ) থেকে:    ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নে কবর থেকে কঙ্কল চুরির হিড়িক পড়েছে। গত রোববার পর্যন্ত কুলিয়ারচর ও গজারিয়া দু’গ্রামে ২৭টি কবরে কঙ্কাল চুরির ঘটনা ঘটেছে।

 

একটি সঙ্গবদ্ধ চক্র মাত্র দুই-আড়াই ফুট মাটি ফাঁক করে অভিনব পদ্ধতিতে একের পর এক কবরের কঙ্কাল চুরির ঘটনায় এলাকায় তোলপাড় চলছে।

 

এদিকে স্বজনরা রাত জেগে তাদের প্রিয়জনের ‘লাশ রক্ষা’র কবর পাহাড়া দিচ্ছেন। এঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে ফুঁসে উঠছে ইউনিয়নবাসী।

 

আজ সোমবার উপজেলার ভাংনামারী ইউনিয়নের কুলিয়ারচর ও গজারিয়া গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মা মা করে কবরে পাশে কাঁদছেন বাচ্চু মিয়া। প্রায় দেড় বছর আগে এই কবরেই শায়িত করেছিলেন তার মা নুর জাহান বেগমের লাশ। চারদিক থেকে খবর আসছে কবরে লাশ নেই। তার মায়ের কবরেও মাথার অংশে ফাঁকা দেখেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

 

তার হৃদয়বিদারক কান্না দেখে গ্রামবাসী এসে গোরস্থানে জড়ো হন। মনের সন্দেহ আর গ্রামবাসীর শংকা দুর করতেই কোদাল নিয়ে সেই কবর খুঁড়ে দেখা যায় কঙ্কল নেই।

 

বাচ্চু মিয়া লোক লোকান্তরকে জানায়, এখন মায়ের শোক ভুলতেই পারছেন না, এবার মায়ের লাশও নেই। যেখানে দাঁড়িয়ে দিনে দু’বার মোনাজাত করতাম। এদিকে কঙ্কল চুরির ঘটনা শুনে হাজী আব্দুল মজিতের পুত্র আবুল হাসাদ বাচ্চু ছুটে যান মায়ের কবরে।

 

কবরের মাথার অংশে দুই-আড়াই ফুট ফাঁকা দেখে চমকে উঠেন। মায়ের লাশ আছে-কিনা নিশ্চিত হতে, গ্রামবাসীকে নিয়ে কবরের মাটি সরিয়ে দেখেন ‘লাশ’ নেই। স্ত্রী’র লাশ নেই এ কথা শোনেই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন হাজী আব্দুল মজিত।

 

এ খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে স্বজনের লাশের সন্ধানে চলে করব খোঁড়াখুঁড়ি। কুলিয়ারচর গ্রামের মৃত রুস্তম আলীর স্ত্রী হাসনা আক্তারের কবর খোঁড়ে কঙ্কাল পাওয়া যায়নি। তিনি মারা যান প্রায় ২বছর পূর্বে। ৩ বছর পূর্বে মারা যান মৃত একিন আলীর পুত্র মোর্শেদ আলী। তার কবরেও লাশ নেই।

 

গজারিয়া গ্রামের কেরামত আলীর পুত্র আব্দুর রাজ্জাক জানান, তার ভাই আবু চান ও সালেহা খাতুনের কবরেও লাশ নেই। একই গ্রামের মৃত বাছির উদ্দিনের স্ত্রী জুবেদা খাতুনের কবরেও লাশ নেই।

 

তার পুত্র আব্দুল খালেক জানান, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিতরেও মায়ের কবর মেরামত করেছি। রাসেল আমার ছেলে বলেছে তার মায়ের কবর ভেঙ্গে গেছে, তারপর মেরামত করেছি। লাশ নেই, সেটা আগে বুঝতে পারি নাই।

 

সোমবার (১২মার্চ) সারাদিনে গ্রামের লোকজন কবর খোঁড়াখুড়ি শেষে নিশ্চিত করেন ২৭টি কবরে কঙ্কাল (লাশ) নেই। এ ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক, মরার পরেও মানুষ শান্তি পাচ্ছে না উল্লেখ করে ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার আব্দুল বারেক জানান, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। পুরো এলাকাজুড়ে প্রিয়জনের লাশের সন্ধানে ছুটছেন স্বজনরা। খবর পেয়ে দূর-দূরান্ত থেকে আত্মীয় স্বজনরাও ছুটে আসছেন।

 

এদিকে ময়মনসিংহ শহরে রোববার কঙ্কাল বিক্রির টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে একই এলাকার আকির হোসেন, রাসেল মিয়া ও হযরত আলী নামের তিনজনের মধ্যে বিবাদ বাধেঁ। এসময় ভাংনামারী ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলামের পুত্র নয়ন মিয়া তাদের এই বাগবিতন্ড শুনতে পান। ফলে তাদের এই কঙ্কাল চুরির ঘটনা ফাঁস হয়।

 

তাৎক্ষণিক নয়ন মিয়া বাড়িতে তার ভাই ফয়সালকে ফোনে এ তথ্য জানান। তার দাদা ওয়াহেদ আলী ও দাদী কদরবানু’র কবরে লাশ আছে কি-না জানতে চান। পরিবারের লোকজন ছুটে গিয়ে দেখেন, দু’টি কবরেই দুই-আড়াই ফুট করে গর্ত (ফাঁকা)। কবরে লাশ নেই! এরপর ছুটে আসেন আত্মীয়-স্বজনও। এ ঘটনার পর থেকে কঙ্কাল চুরি চক্রের তিন সদস্য পলাতক রয়েছে।

 

এ ব্যাপারে ভাংনামারী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মফিজুন নূর খোকা বলেন, জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ দেলোয়ার আহম্মদ বলেন, লাশ চুরির ঘটনা শুনেছি, এখন পর্যন্ত কেউ মামলা করতে আসেনি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

 

ছবিঃ লোক লোকান্তর

সর্বশেষ আপডেটঃ ৮:৩০ অপরাহ্ণ | মার্চ ১২, ২০১৮