|

নষ্ট ডেমু ট্রেন নিয়ে বিপাকে রেলওয়ে

লোক লোকান্তরঃ  স্বল্পসময়েই একের পর এক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ডেমু ট্রেনগুলো। অথচ মাত্র ৫ বছর আগে ৬৫৪ কোটি টাকায় চীন থেকে ২০ সেট ডেমু ট্রেন কিনে আনা হয়। বর্তমানে তার ১১ সেটই নষ্ট। আর দেশে নষ্ট হওয়া ডেমু ঠিক করার মতো ব্যবস্থাও নেই।

 

ট্রেনে করে দ্রুত শহরতলির মানুষ যাতে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের মতো বড় শহরে প্রতিদিন যাতায়াত করতে পারে, সেই লক্ষ্যে ডেমু আমদানি করা হয়েছিল। আর ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের অধীনে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে প্রথম ডেমু ট্রেন চালু করা হয়।

 

ডেমু ট্রেনের দুই দিকে দুটি ইঞ্জিন এবং মাঝখানে একটি বগি থাকে। বগির পাশাপাশি ইঞ্জিনেও যাত্রী বহন করা যায়। অর্থাৎ, দুই ইঞ্জিন এবং এক বগি নিয়েই এক সেট ডেমু। সব মিলিয়ে এক সেট ডেমুতে বসে ১৪৯ জন এবং দাঁড়িয়ে ১৫১ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারে। এর বেশি যাত্রী উঠলেই ডেমু অকেজো হয়ে যায়। তাই প্রথম দিকে গুনে গুনে ডেমুতে যাত্রী ওঠাতেন রেলের কর্মীরা। ডেমু ট্রেন এদেশের জন্য উপযোগী না হওয়া সত্ত্বেও তা আমদানি করে রেলওয়ে এখন বিপাকে। রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, মূলত রাজনৈতিক বিবেচনায় এক বিভাগীয় শহর থেকে অন্য বিভাগীয় শহরে ডেমু চালানো হয়। কিন্তু একটানা দীর্ঘ পথ চালানোর জন্য ডেমু উপযুক্ত নয়। ফলে গতবছরের শেষের দিকে একে একে ১১ সেট ডেমু বিকল হয়ে যায়। অথচ ডেমুর টাকা দিয়ে ১৩০টি এসি বগি কেনা যেত। বগি কেনা হলে স্টেশনে টিকিটের জন্য হাহাকার যেমন কমতো, একটি এসি বগি থেকে বছরে আড়াই কোটি টাকা আয় হতো। অথচ ডেমুতে বিনিয়োগের কারণে রেলকে ডেমু ট্রেনে লোকসান গুনতে হচ্ছে।

 

সূত্র জানায়, ডেমু স্বল্প দূরত্বে (সর্বোচ্চ ২০ কিলোমিটার) চলাচলের উপযোগী হলেও ২০১৩ সালের মে মাসে চট্টগ্রাম-লাকসাম রেলপথে এই ট্রেনে যাত্রী পরিবহন শুরু হয়। ওই পথের দূরত্ব প্রায় ১৩০ কিলোমিটার। পর্যায়ক্রমে রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলেও ডেমু চালু করা হয়।

 

ডেমু যেসব পথে চলছে-  তার মধ্যে ঢাকা-জয়দেবপুরের দূরত্ব ৩৪ কিলোমিটার, ঢাকা-টঙ্গী ২২ কিলোমিটার, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ ৯০ কিলোমিটার, সিলেট-আখাউড়া ১৭৬ কিলোমিটার, ঢাকা-আখাউড়া ১২০ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-কুমিল্লা ১৫৫ কিলোমিটার, নোয়াখালী-লাকসাম ৪৮ কিলোমিটার, লাকসাম-চাঁদপুর ৪৯ কিলোমিটার, চট্টগ্রাম-নাজিরহাট ৩৭ কিলোমিটার, পার্বতীপুর-লালমনিরহাট ৭১ কিলোমিটার এবং পার্বতীপুর-পঞ্চগড়ের দূরত্ব ১৩২ কিলোমিটার।

সূত্র আরো জানায়, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ১৮ সেট ডেমু পরিচালনা করে ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে গতবছরের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় হয় ১৭ কোটি ৩৫ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫২ টাকা। একই সময়ে মোট ৮১ লাখ ৪৭ হাজার ২৭০ যাত্রী পরিবহন করা হয়। পশ্চিমাঞ্চলে ২০১৩ সাল থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১০ লাখ ৯৩ হাজার ৭১৮ যাত্রী পরিবহন করে ডেমু ট্রেন থেকে রেলের আয় ২ কোটি ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৩৪ টাকা।

 

আর ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেমু পরিচালন খরচ প্রায় ২৫ কোটি টাকা। তার মধ্যে জ্বালানির জন্যই বেশির ভাগ ব্যয় হয়েছে। লোকোমাস্টারের (ট্রেনচালক) বেতন-ভাতা ও টিকিট বিক্রিতে জনবলের খরচ এর সঙ্গে যুক্ত।

 

এদিকে মাত্র পাঁচ বছরে বেশির ভাগ ডেমুর ইঞ্জিন নষ্ট হয়ে যাওয়াকে রেলের প্রকৌশলীরা অস্বাভাবিক ঘটনা বলে মনে করেন। তাদেও মতে, সাধারণত রেলের ইঞ্জিনের গড় আয়ু থাকে ২৫ বছর। আর বগির ক্ষেত্রে তা ২০ বছর। মেরামত করে ইঞ্জিন ও বগি আরও কয়েক বছর চালানো যায়।

 

অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে রেলের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন জানান, নীতিগত কিছু ভুলের কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আসলে স্বল্প দূরত্বে চালানোর জন্য ডেমু কেনা হয়েছিল। আর ডেমু ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেশে কোনো ওয়ার্কশপ (মেরামত কারখানা) নেই। তবে নষ্ট হওয়া ডেমু ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নারায়ণগঞ্জে একটি ওয়ার্কশপ করার পরিকল্পনা রয়েছে।

সর্বশেষ আপডেটঃ ৮:৫০ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ০৭, ২০১৮