|

রোহিঙ্গাদের নির্মূলে ধর্ষণকেও অস্ত্র হিসেবে নিয়েছে মিয়ানমারের সেনারা

লোক লোকান্তর : রোহিঙ্গাদের জাতিগত নির্মূল সাধনে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ধর্ষণকেই অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে বলে আলামত পেয়েছে জাতিসংঘের চিকিৎসকরা।

 

রয়টার্সে প্রকাশিত এ প্রতিবেদনে বলা হয়, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সহিংসতার মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা মুসলিমদের মধ্যে এমন কয়েক ডজন নারী চিকিৎসা নিয়েছেন, যাদের আঘাতগুলো নৃশংস যৌন হামলার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

 

এর আগেও রোহিঙ্গাদের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, দলবদ্ধভাবে ধর্ষণের অভিযোগ আনা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোকে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি কলঙ্কিত করার জন্য সাজানো প্রপাগান্ডা বলে পাল্টা অভিযোগ করে মিয়ানমারের কর্মকর্তারা।

 

২৪ আগস্ট রাতে সহিসংতা ছড়িয়ে যাওয়ার পর থেকে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাদের বিভিন্নভাবে চিকিৎসা সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসা সেবা দেওয়া আটজন স্বাস্থ্যকর্মীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে ২৫ জনের বেশি ধর্ষণের শিকার নারীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে কি করা হয়েছিল, তা সুনির্দিষ্টভাবে বের করার চেষ্টা তারা করেননি। অনেক নারীর শরীরে আঘাতের নমুনা দেখা গেছে, যার জন্য তারা একবাক্যে মিয়ানমারের সেনাদেরকে দায়ী করেন।

 

স্পশর্কাতর বিষয় হওয়ার কারণে সচরাচর কোনো রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে জাতিসংঘ ও সাহায্য সংস্থাগুলোর চিকিৎসকদের মুখ খোলার ঘটনা বিরল।গত বছরের অক্টোবরে রোহিঙ্গা নারীরা সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, এমন সংবাদ পরিবেশন করেছিল রয়টার্স। পরবর্তীতে জাতিসংঘের তদন্ত দলও একই অভিযোগ শোনেন বাংলাদেশ সফরের সময়। এ বছরের এপ্রিলে জাতিসংঘ মহাসচিবের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে হেয় ও সন্ত্রস্ত করতে পদ্ধতিগতভাবে যৌন নিপীড়ন হাতিয়ার বানানো হচ্ছে।

 

ক্ষমতায় যাওয়ার আগে সুচি দেশটিতে জাতিগত দ্বন্দ্বের মধ্যে ধর্ষণকে অস্ত্র বানানো হচ্ছে বলে এর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন। বর্তমান অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে তার মুখপাত্র জাউ হ্যাতি বলেন, ‘কিছুই বলার নেই। সবকিছুই আইন অনুযায়ী হবে।

 

সেনা নেতৃত্ব বলেছে, তারা ব্যবস্থা নেবেন।’উখিয়ায় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ড. মিসবাহ উদ্দিন আহমেদ জানান, জাতিসংঘের সাহায্যে পরিচালিত সরকারি ক্লিনিকগুলোর চিকিৎসকরা ১৯ জন ধর্ষিত নারীকে চিকিৎসা দিয়েছেন। চিকিৎসা নিতে আসাদের মধ্যে যা দেখা গেছে তা হলো , ‘যেসব আলামত পাওয়া গেছে, তার মধ্যে আছে, কামড়ের দাগ, যোনিমুখ ছিঁড়ে ফেলা… এই ধরনের চিহ্ন।’

 

১৪ সেপ্টেম্বর একদিন ছয় নারী একই ক্লিনিকে সেবা নিয়েছেন। যাদের প্রত্যেকের অভিযোগ তাদের ওপর যৌন নিপীড়ন চালানো হয়েছে। তারা বলছেন, ‘মিয়ানমারের সেনারা এসব করেছে।’আইওএমের এক চিকিৎসক, যিনি কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের কাছাকাছি অবস্থিত একটি ক্লিনিকে কর্মরত রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অাগস্টের শেষে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা এক নারী বলেছেন, তাকে অন্তত সাতজন সৈনিক মিলে ধর্ষণ করেছে।’

 

এ চিকিৎসকই প্রায় ১৫ থেকে ১৯ জন নারীকে চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন বলে তার মনে হয়েছে। আর ৮ জন নারীকে চিকিৎসা দিয়েছেন যারা শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হয়েছেন। ওই চিকিৎসক বলেন, ‘তাদের মধ্যে অনেককে জরুরি ভিত্তিতে জন্মনিয়ন্ত্রণ ওষুধ দেওয়া হয়েছে। এইচআইভি ছড়ানোর ঝুঁকি কমাতে সবাইকে চিকিৎসা এবং হেপাটাইটিসের প্রতিষেধক দেওয়া হয়েছে। তাদের হাতে ও পিঠে কামড়ের দাগ, যৌনাঙ্গে কাটা-ছেঁড়া ও যৌনাঙ্গে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল।’

 

কক্সবাজারে মেডিসিন্স সন্স ফ্রঁতিয়েসের (এমএসএফ) জরুরি চিকিৎসা সমন্বয়ক কেইট হোয়াইট বলেন, ‘২৫ অাগস্টের পর অন্তত ২৩ নারীকে পেয়েছি যারা দলবদ্ধ ধর্ষণ ও যৌন নিপীড়নসহ লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। সেখানে এধরণের যত ঘটনা ঘটেছে, এগুলি তার একটি অংশমাত্র।’

 

সাহায্য সংস্থাগুলোর একটি হালনাগাদ প্রতিবেদনে লিঙ্গভিত্তিক বেশ কিছু সহিংসতার চিহ্ন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে ২৫ অগাস্টের পর থেকে ৩৫০ জনের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সম্পর্কিত ‘প্রাণরক্ষার সেবা’ দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কক্সবাজারের সাহায্য সংস্থাগুলোর তৈরি আভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২৯ থেকে ৩১ অাগস্ট পর্যন্ত চার দিনে ৪৯ জন ‘এসজিবিভি সারভাইভর’ নথিবদ্ধ হয়েছে। শুধুমাত্র ধর্ষণের ক্ষেত্রেই জাতিসংঘের চিকিৎসকরা ‘এসজিবিভি বা যৌনতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা’ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করে থাকেন। সূত্র: রয়টার্স

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ১২:১৮ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ২৫, ২০১৭