|

পোল্ট্রি শিল্পে নীরব বিপ্লব, দরকার সরকারি প্রনোদণা

কাজী মোহাম্মদ মোস্তফা:   গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ পোল্ট্রি শিল্পে নীরব বিপ্লব ঘটে গেছে। বিশ্বের কিছু দেশে বার্ড ফ্লু ছড়িয়ে পড়ার পর মাঝে এ শিল্প কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও আবারো ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

 

পোল্ট্রি শিল্পে নীরব বিপ্লবের কারণে দেশে প্রাণিজ আমিষের অভাব মিটছে। মিটছে পুষ্টি চাহিদাও।

 

কম সময়ে অল্প পুঁজি বিনিয়োগে মুরগি পালন একটি সম্ভাবনাময় ও লাভজনক কৃষি শিল্পে পরিনত হয়েছে। সঠিক পরিকল্পনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মুরগির খামার গড়ে এ শিল্পকে সহজেই লাভজনক করে গড়ে তোলা যায়।

 

সাধারণত দু’ধরনের- মুরগির খামার হয়ে থাকে। পারিবারিক খামার ও বাণিজ্যিক খামার। পারিবারিক খামারে অল্পসংখ্যক মুরগি পালন করে সে অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অনেকেই বাণিজ্যিক খামার গড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। অনেক শিক্ষিত বেকার পোল্ট্রি খামার গড়ে সাবলম্বী হয়েছেন। এ উদাহরণ খুব কম নয়।

 

উৎপাদনের উদ্দেশ্যের ওপর ভিত্তি করে মুরগির খামার বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। মাংস উৎপাদনের জন্য মুরগি পালন আর ব্রয়লার ও ডিম উৎপাদনের জন্য লেয়ার খামার। তবে যে খামারই হোক না কেন তা লাভজনক করতে দরকার সুষ্ঠু পরিকল্পনা ও বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনা। সরকারি প্রনোদনার সাথে বেসরকারি উদ্যোগ মিলেমিশে এ শিল্প অনেক বড় একটি খাতে পরিণত হতে পারে। এতে একদিকে দেশের মানুষের পুষ্টি চাহিদা মিটবে আবার ডিম ও মাংস রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

খামার গড়তে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে মৎস্য ও পশুসম্পদ অধিদপ্তর।

 

কিভাবে গড়বেন খামার:
বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে স্থায়ী ব্যবস্থায় মুরগির খামার বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যেমন ডিম উৎপাদন, মাংস উৎপাদন, প্রজনণ, ব্রিডার,বাচ্চা উৎপাদন খামার ইত্যাদি। যে কোনো ধরনের মুরগি খামারই ব্যবসা সফল খামার পরিচালনার জন্য সঠিক স্থান নির্বাচন করা খুবই গুরুত্বপূণ।
স্থান নির্বাচনের সময় কিছু বিয়য়ে গুরুত্ব দিতে হবে।
১. বন্যার পানি থেকে বাঁচতে খামার হতে হবে সমতল স্থান থেকে উঁচুতে।
২. মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা বেশী থাকতে হবে ,যেখানে মাটি,বালু ও কাঁকর থাকবে।
৩. পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৪. কোলাহলমুক্ত স্থান হলে ভালো হয়।
৫. যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হতে হবে।
৬. বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
৭. সহজে ও সস্তায় মুরগির খাদ্য ক্রয় করার সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে।
৮. উৎপাদিত পণ্য সহজে বাজারজাতকরণের সুযোগ থাকতে হবে।
৯. নির্বাচিত স্থানের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম কি না সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে।
১০. খামারের মুরগির রোগ দমন ও টিকা-ভ্যাকসিন দেয়ার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক নিয়োগ করতে হবে।
১১. ডিম/ব্রয়লার উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারনের জন্য লেয়ার/ব্রয়লার পালনের ঘর বা শেড এবং অন্যান্য সুবিধা, যেমন-

অফিস, শ্রমিক ঘর, খাদ্য গুদাম, মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের ঘর, সংরক্ষণাগার ইত্যাদি তৈরির জন্য মোট জায়গার সাথে প্রায় দেড় গুণ ফাঁকা জায়গা রেখে খামারের মোট জমির পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে।

 

কিভাবে তৈরি করবেন মুরগির শেড:
খামারের নির্বাচিত স্থান মুরগির নিরাপদ ও আরামদায়কভাবে উপযোগী করে তৈরি করতে হবে যাতে ঝড়বৃষ্টি বা প্রাকৃতিক দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। শেডের ভিতরে  আলো এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সামর্থ্য অনুযায়ী শেড পাকা, কাঁচা বা টিনের হতে পারে। মুরগির জাত অনুযায়ী প্রতি শেডে মুরগি রাখতে হবে । শেডের মোট জায়গার পরিমাণ হিসেব করে ঘর তৈরি করতে হবে। শেডের দুটি ঘরের মাঝে ২৫-৩০ ফুট জায়গা আলো ও মুক্ত বাতাস  প্রবাহের জন্য খালি রাখা প্রয়োজন।

 

যেভাবে তৈরি করবেন মুরগির ঘর:
প্রতিটি ব্রয়লার মুরগি বাজারজাত করার আগ পর্যন্ত ১ বর্গফুট জায়গার দরকার। এভাবে হিসেব করে ব্রয়লার উৎপাদনের সংখ্যার উপর ভিত্তি করেই ঘরের সংখ্যা নির্ধারণ করতে হবে। সাদা খোসার ডিম উৎপাদনকারী  প্রতিটি মুরগির জন্য ৩ বর্গফুট এবং বাদামি খোসার ডিম উৎপাদনকারী মুরগির জন্য ৪ বর্গফুট জায়গা উপোযোগী করে ঘর তৈরি করতে হবে। খাঁচায়, মাচাঁয় অথবা লিটার পদ্ধতিতে এসব মুরগিও পালন করা যায়। ঘরের পরিমাণ পালন পদ্ধতির উপর নির্ভর করে।

 

খাঁচা পদ্ধতিতে প্রতিটি উৎপাদনশীল মুরগির জন্য কেইজে ৬০-৭০ বর্গইঞ্চি জায়গা প্রয়োজন পড়ে। এ হিসেবে খাঁচা তৈরি করে খাঁচার সারি লম্বালম্বিভাবে এক সারি বা একটার উপর আরেকটা রেখে ৩/৪ সারি করা যায়। আবার সিঁড়ির মতো করে সাজিয়ে দুই পাশে সারি করা যায়। প্রতিটি উৎপাদনশীল মুরগির জন্য প্রয়োজনীয় জায়গার পরিমাণ মাচায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৩ বর্গফুট এবং লিটারে ১ দশমিক ৫ থেকে ১ দশমিক ৭৫ বর্গফুট। মুরগির দৈহিক ওজন এবং আবহাওয়াভেদে এই মাপের পরিবর্তন হতে পারে। লিটার পদ্ধতিতে সাধারণত প্রতি ১০ বর্গফুট মেঝের জন্য ৫ কেজি লিটার প্রয়োজন হয়। এ পদ্ধতিতে মুরগি পালনে ঘরের মেঝে পাকা হলে ভালো হয়।

 

খামারের ঘরের চালা ও বেড়ার দেয়ার নিয়ম:
দো-চালা বা গোল ধরনের চালই মুরগির ঘরের জন্য বেশি আরামদায়ক। লেয়ার মুরগি ঘরের বেড়ার উচ্চতার পুরোটাই তারের নেট  দিয়ে তৈরি করতে হবে। বেশি বাতাস বা বেশি শীত হতে মুরগি রক্ষা করার জন্য বেড়ার ফাঁকা অংশে প্রয়োজনে চটের পর্দার ব্যবস্থা করতে হবে।

 

ডিম পাড়ার বাসা, আলোকায়ন, মুরগির খাদ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষেধক টিকা এবং চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধপত্রের সহজ প্রাপ্যতা হতে হবে। খামার হতে বার্ষিক কত টাকা আয় হতে পারে তা পূর্বেই নির্ধারণ করে অনুমেয় মুনাফায় খামারজাত পণ্য হতে ১০-১২ শতাংশ হারে লাভে মোট কত টাকা আয় হতে পারে তা হিসেব করে দেখতে হবে। বর্তমান বাজার দরের সাথে তাল মিলিয়ে কতগুলো ডিম বিক্রি করলে এ নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আয় করা সম্ভব তা হিসেব করতে হবে। এসব বিষয় হিসেব করে তবেই খামারের পরিকল্পনা  নিতে হবে। এভাবে সকল খরচের হিসাব  মোট আয় থেকে বাদ দিলেই প্রকৃত লাভ-লোকসান পাওয়া যাবে।

 

এক নজরে বাংলাদেশের পোল্ট্রি খাত
বর্তমানে দেশে মুরগির মাংস দৈনিক প্রায় ১৮৫১ মেট্রিক টন ও ডিম উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ২ কোটি ২০/ ২৫ লাখ । আর একদিন বয়সী মুরগির বাচ্চার সাপ্তাহিক উৎপাদন প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ। আগে বিদেশ থেকে হ্যাচিং ডিম আমদানি হতো। এখন বাংলাদেশে ৭টি গ্রান্ড প্যারেন্টস্টক (জিপি) ফার্ম আছে। প্যারেন্টস্টক ফার্মের সংখ্যা ছোট-বড় মিলে প্রায় ৮০টি। অভ্যন্তরীন উৎপাদন দিয়েই দেশের হ্যাচিং ডিমের শতভাগ চাহিদা পূরণ হচ্ছে।

 

দেশে পোল্ট্রি ফিড মিলের সংখ্যা প্রায় ১৮৬টি। এর মধ্যে প্রায় ৭০টি আধুনিক এবং নিবন্ধিত ফিড মিলে রয়েছে । আগে শতভাগ প্যাকেটজাত আমদানি নির্ভর ছিল।

 

পোল্ট্রি ফিডের ২০১৪ সালে বার্ষিক উৎপাদন ছিল প্রায়: ২৫ লাখ, ২০১৬ সালে ৩৫-৩৭ লাখ, বর্তমানে (২০১৭ সালে) ৪০ লাখ মেট্রিক টন। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে দেশেই  উৎপাদিত হচ্ছে প্রায় ৯৫ ভাগ ফিড। পোল্ট্রি শিল্পের কাঙ্খিত লক্ষ্য ভিশন-২০২১ নিশ্চিত করতে হলে পোল্ট্রি ফিডের বার্ষিক উৎপাদন প্রয়োজন হবে প্রায়: ৫৫-৬০ লাখ মেট্রিক টন ।
২০১৪ সালে মুরগী মাংসের উৎপাদন ৫ লাখ ৫১ হাজার, ২০১৫ সালে ৫ লাখ ৭৪ হাজার, ২০১৬ সালে ৬ লাখ ৭৫ হাজার, আর ২০২১ সালে দরকার হবে প্রায় ১২.৫ লাখ মেট্রিক টন।

 

২০১৪ সালে ডিমের বার্ষিক উৎপাদন ৬৩৯ কোটি,২০১৫ সালে ৭১২কোটি, ২০১৬ সালে ৮২১ কোটি আর ২০২১ সালে দরকার হবে প্রায় ১৪৮০ কোটি।

 

একদিন বয়সী বাচ্চার বার্ষিক উৎপাদন ২০১৪ সালে ৪৩.২ কোটি, ২০১৫ সালে ৪৭.৫ কোটি, ২০১৬ সালে ৫০.৪ কোটি, আর ২০২১ সালে দরকার হবে প্রায় ৯৮ কোটি।
দেশে ভূট্টার উৎপাদন

 

মোট চাহিদার মাত্র ৪০-৪৫ শতাংশ ভূট্টা দেশে উৎপাদিত হয়। আগে পোল্ট্রি শিল্পে প্রয়োজনীয় ভূট্টার প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হতো। পোল্ট্রি ফিডের জন্য চালের কুঁড়া বা রাইস পলিসও দেশেই পাওয়া যায়। তবে পোল্ট্রি ফিডে ব্যবহৃত সয়াবিনের পুরোটাই আমদানি করতে হয়। সয়াবিনের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য সরকারি উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজন।

 

রোগ প্রতিশেধক ঔষধ প্রাপ্যতা
এক সময়ে পোল্ট্রি শিল্পের জন্য দেশে তেমন কোন ঔষধ/ভ্যাকসিন তৈরি হত না। আমদানি নির্ভর ছিল গোটা পোল্ট্রি শিল্প। কিন্তু এখন প্রায় ৩০টি কোম্পানী বিভিন্ন রোগের ঔষধ তৈরি করছে। ফলে আমদানি নির্ভরতা অনেকাংশে কমেছে।

 

পোল্ট্রি বর্জ্যে সম্ভাবনা
পোল্ট্রি একটি পরিবেশ বান্ধব শিল্প । বিভিন্ন ধরনের প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে রয়েছে ডিমের ব্যবহার । এছাড়া ডিমের খোসা দিয়ে জৈব সার, আর্ট ওয়ার্ক, ঘর-সাজানোর সরঞ্জামাদিও তৈরি হয়। পোল্ট্রি বিষ্টা বা লিটার দিয়ে তৈরি হয় বায়োগ্যাস, জৈব সার এবং বিদ্যুৎ। সরকারি সহযোগিতা পেলে পোল্ট্রি রিসাইক্লিং করে দেশের চেহারাই পাল্টে ফেলা সম্ভব। মুরগির বিষ্টা বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর কৃষি সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পরিবেশবান্ধব এই শিল্প থেকে আমাদের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। পোল্ট্রি লিটার থেকে বছরে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়।

 

ভ্রান্ত ধারনা
ব্রয়লার মাংস ও ডিম সম্পর্কে অনেকেরই ভুল ধারণা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন মুরগির ফিডে ক্ষতিকারক হরমোন ব্যবহার হয়। কিন্তু ধারণাটি সম্পূর্ণই ভুল। জেনেটিক্যালি ইমপ্রুভড বার্ডকে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করলে মুরগির স্বাভাবিক বৃদ্ধি এমনিতেই সম্ভব। অনেকের ধারনা, ডিম ও ব্রয়লার মাংস উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার করা হয়ে থাকে। জেনে রাখা জরুরী সরকার পোল্ট্রি শিল্পে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তবে একেবারেই যে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হচ্ছে না, তা নয়। অভিজ্ঞ ভেটেনারিয়ানের পরামর্শে মুরগির রোগ হলে তবেই অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার হয়।

 

এক্ষেত্রে জনসাধারণকে পোলট্রি সম্পর্কে আরো বেশি শিক্ষিত ও সচেতন করা উচিত।
অনেকেই এখন রেডমিট বর্জনের কথা বলে থাকেন। মুরগির মাংস অন্যান্য মাংসের তুলনায় ভাল। গরু ও শূকরের মাংসে ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও ছাগল-খাসী,ভেড়ার দাম বেশী হওয়ায় পোল্ট্রির মাংস সার্বজনীন। গরুর মাংসে আমিষ ও স্নেহের পরিমাণ ১৭ ও ১.১৩ শতাংশ। বিপরীতে মুরগির মাংসে তা যথাক্রমে ১৯ ও দশমিক ৬ শতাংশ।

 

বাজেট ব্যবস্থাপনা ও পোল্ট্রি শিল্প
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ভিশন-২০২১’ এর সফলতার জন্য কাজ করছে। ৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় বাংলদেশের মানুষের বছরে মাথাপিছু ডিম খাওয়ার পরিমান বর্তমানের ৪৫-৫০ টি থেকে ১০৪টিতে  বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। খাদ্যের পাশাপাশি সরকার পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার উপর জোর দিয়েছেন। প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে সরকারের এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে হলে ২০২১ সাল নাগাদ দৈনিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি ডিম এবং দৈনিক প্রায় ৩ দশমিক ৫ থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন মুরগির মাংস উৎপাদন করতে হবে।

 

সুস্থ থাকতে একজন মানুষের বছরে অন্তত ৪৩ দশমিক ৮০ কেজি প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ গ্রহণ করে গড়ে মাত্র ১৫ দশমিক ২৩ কেজি। বিনিয়োগ দরকার হবে প্রায় ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে বিনিয়োগ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এ খাতে বার্ষিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান হার প্রায় ১৫-১৮ শতাংশ। ২০০৭ সালের আগে তা ছিল প্রায় ২০%। জিডিপি’তে পোল্ট্রি শিল্পের অবদান প্রায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ।

 

গার্মেন্টসের পর পোল্ট্রি শিল্পই বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। প্রায় ৬০ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এ শিল্পের সাথে জড়িত। এ সময়ের মধ্যে ছোট-বড় ও মাঝারি আকারের পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৩ লাখ। আর তা হলে দেশের বৃহত্তর খাত হিসেবে পোল্ট্রি শিল্প আত্ম-প্রকাশ করবে। পোল্ট্রি খামার জেলা, উপজেলা থেকে ছড়িয়ে ইউনিয়ন  পর্যায়ে চলে যাবে।

 

পোল্ট্রি একটি স্পর্শকাতর শিল্প। রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলে একজন স্বচ্ছল খামারিও রাতারাতি নিঃস্ব হয়ে পথে বসতে পারেন। দেশে ২০০৫, ২০০৯ এবং ২০১১ সালে এভিয়ান ইনফ্লয়েঞ্জার (বার্ড-ফ্লু) সংক্রমনে অনেক খামারি হারিয়েছেন তাদের পুঁজি ও বেেেড়াছ ঋণের বোঝা। তাই এ খাতে ২০২১ সালের চাহিদা পূরণে যে বিশাল বিনিয়োগের দরকার তা নিশ্চিত করতে ব্যাংক ঋণ সহজ করাসহ দরকার সরকারি প্রণোদনা। কিন্তু সরকারের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তের কারণে এ শিল্পে আবারও ধস নামার শঙ্কা রয়েছে। খামারিরা উৎপাদন খরচের টাকা তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন। অনেক খামার বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

 

২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে কর অব্যহতি সুবিধা তুলে নেয়ার কারণে চলতি অর্থবছর থেকে চাপের মুখে পড়েছেন পোল্ট্রি খামারি ও উদ্যোক্তারা। ফলে মুরগির বাচ্চা, ফিড, ডিম ও উৎপাদন খরচ আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে।
পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন- ২০০৫, ২০০৯, ২০১১ সালে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্প বার্ড-ফ্লু’র ভয়াবহ সংক্রমনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে খামারিদের অন্তত: ১০ বছর সময় প্রয়োজন। তাই  নূন্যতম আয়কর নির্ধারণ করে, এআইটি এবং আমদানি শুল্ক প্রত্যাহার চান পোল্ট্রি খাত সংশ্লিষ্টরা।

 

পোল্ট্রি শিল্পের প্রতিবন্ধকতাসমূহ:
২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে পোল্ট্রি শিল্পের কর অব্যহতি সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
পোল্ট্রি শিল্পের আয়ের উপর কর আরোপ করা হয়েছে। বেশ কিছু অত্যাবশ্যকীয় কাঁচামাল এবং ঔষধ আমদানিতে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এডভান্স ইনকাম ট্যাক্স (এআইটি) আরোপ করা হয়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। এইচ.এস কোডের জটিলতায় চট্টগ্রাম কাস্টমস থেকে পণ্য খালাস করতে জটিলতা ও ভোগান্তি বেড়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে সুদের হার অনেক বেশি। বিদেশী কোম্পানীগুলো ২/৩ শতাংশ হারে ঋণ এনে এদেশে ব্যবসা করছে। ফলে মার খাচ্ছে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প বিদেশীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে।
পোল্ট্রি খামারিদের জন্য কোন প্রণোদনা  বা সহায়তা তহবিল নেই।

 

পোল্ট্রি খাতে পুঁজির নিরাপত্তা নেই। নেই পোল্ট্রি বীমাও। পোল্ট্রি’র পাইকারি বাজারে খামারি কিংবা উদ্যোক্তাদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই।

 

এ খাতে মধ্যস্বত্ত্বভোগীদের দৌড়াত্ম্যে খামারিরা রীতিমত অসহায়।
পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের তথ্য-উপাত্ত হাল নাগাদ না থাকার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অনুমান-নির্ভর তথ্য ব্যবহার হচ্ছে।

 

বার্ড-ফ্লু’র ভ্যাকসিনের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহে লো-প্যাথজেনিক ভাইরাসের কারণে ক্ষতির মুখে পড়ছে পোল্ট্রি খাত।
দেশীয় পোল্ট্রি শিল্প রফতানির জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। প্রয়োজন পোল্ট্রি জোনিং বা কমপার্টমেন্টালাইজেশন। কিভাবে হবে তার কোনো দিক নির্দেশনা নেই।

 

নিরাপদ ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। রেগুলেটরি বডি কে? শুধু কী ভ্রাম্যমান আদালতের অভিযানই যথেষ্ঠ?

 

সরকারের কাছে প্রত্যাশা  
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারের দেয়া কর বাতিল করে ২০২৫ সাল পর্যন্ত মওকুফ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

 

কমদামে আমিষ খাদ্য নিশ্চিত করতে পোল্ট্রি শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামাল, ঔষধ এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি আমদানির উপর কর, ভ্যাট তুলে নেয়ার দাবি। সেইসাথে আগাম আয়কর (এআইটি) বাতিল করে কাস্টমস জটিলতা নিরসনেরও দাবি তাদের।

 

২০২১ সাল নাগাদ প্রয়োজনীয় বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে ব্যাংক ঋণের উপর সুদের হার সহজ করারও দািব আছে এ খাতের উদ্যোক্তাদের।

 

দেশীয় পোল্ট্রি শিল্পকে শক্তিশালী ও আত্ম-নির্ভরশীল করতে এ শিল্পে নতুন বিদেশী বিনিয়োগ আগামী ১০ বছরের জন্য বন্ধ রাখার দাবি বহুদিনের।

 

ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের সহায়তার জন্য বিগত বছরগুলোতে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি তহবিল গঠন করা হয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সাহায্য বন্ধ হওয়ার পর থেকে তহবিলের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়েছে। কাজেই স্পর্শকাতর এ শিল্পের ঝুঁকি প্রশমনে একটি সহায়তা তহবিল গঠনের দাবি আছে উদ্যোক্তাদের।

 

উদ্যোক্তারা বলছেন, ২০২১ সাল নাগাদ এ শিল্পে বিনিয়োগের পরিমান ৫০-৬০ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত করতে  পুঁজির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। পোল্ট্রি শিল্প বীমার আওতায় আনতে হবে। বার্ড-ফ্লু’র ভ্যাকসিন আমদানি সংক্রান্ত জটিলতার দীর্ঘমেয়াদী সমাধান করতে হবে।   ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিদের রক্ষায় সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে।
ডিম ও মাংসের উৎপাদন নিশ্চিত করতে অবৈধ ও অবাঞ্ছিত খামার ও ফিড মিল বা বিষাক্ত খাবার তৈরির বা এর উপকরণ তৈরির কারখানাগুলো বন্ধে অভিযান চালাতে সুপারিশ আছে এ খাতের উদ্যেক্তাদের।

 

সম্ভাবনাময় এ শিল্প ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১২০০ কোটি ডিম ও ১০০ কোটি ব্রয়লার উৎপাদনের স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের হিসেব মতে, ২০২১ সাল নাগাদ দেশে প্রতিদিন সাড়ে ৪ কোটি ডিম ও প্রায় ৪ হাজার টন মুরগির মাংসের প্রয়োজন হবে। খামারিদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ, পোল্ট্রিশিল্পের জন্য বীমা প্রথা চালু এবং পোল্ট্রি নীতিমালা বাস্তবায়ন তথা পোল্ট্রি শিল্পের উন্নয়ন সম্ভব হলে ২০২১ সালের মধ্যে লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেইসাথে ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে বলে মনে করেন কৃষি উন্নয়ন ব্যক্তিত্বরা।

সর্বশেষ আপডেটঃ ২:৫৭ অপরাহ্ণ | আগস্ট ২০, ২০১৭