|

শিক্ষক ও অবকাঠামো সঙ্কট থেকে বেরোতে পারছে না প্রাথমিক শিক্ষা

লোক লোকান্তর : শিক্ষক ও অবকাঠামো সঙ্কট থেকে বেরোতে পারছে না প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের ৬৪ হাজার বিদ্যালয়ের মধ্যে ২১ হাজারেই প্রধান শিক্ষক নেই। তাছাড়া প্রশিক্ষিত, দক্ষ শিক্ষকের অভাবও প্রকট। পাশাপাশি সংস্কারের অভাবে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বাড়ছে। ফলে বিপুলসংখ্যক শিশু শিক্ষার্থী নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ছে। দেশে মোট প্রায় ৬৪ হাজার বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।

 

প্রধান শিক্ষক ছাড়া পরিচালিত ২১ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কাজ সাধারণত একজন সহকারী শিক্ষক চালাচ্ছেন। আর সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনে কর্মঘণ্টার বেশির ভাগ সময়ই প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে শিশুদেও পাঠদান কার্যক্রম। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, প্রাথমিক শিক্ষা খাতে প্রধান শিক্ষক সঙ্কট নিরসনে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) গতবছরের আগস্ট মাসে প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে নিয়োগের জন্য ৩৪তম বিসিএস থেকে ৮৯৮ জনকে সুপারিশ করেছিল। কিন্তুওই নিয়োগ গত এক বছরেও হয়নি। অধিদপ্তর পদোন্নতির লক্ষ্যে জ্যেষ্ঠতার তালিকা তৈরি করতে পারেনি বলে পিএসসি নিয়োগ দিতে পারছে না। প্রধান শিক্ষক সঙ্কট মারাত্মক আকার ধারণ করলেও শিগগির তা থেকে মুক্তিরও পথ নেই। কারণ ওই পদটি ইতিমধ্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত হয়েছে এবং এখন ওই পদে নিয়োগ ও পদোন্নতির দায়িত্ব পিএসসির।

 

আর বর্তমানে জরাজীর্ণ বিদ্যালয়ের সংখ্যাও বেড়ে ১০ হাজারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে ঝড়বৃষ্টি বা প্রচ- রোদের মতো বৈরী আবহাওয়ার দিনগুলোতে বড় সমস্যায় পড়তে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। ওসব বিদ্যালয় ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে খসে পড়েছে পলেস্তারা। বেরিয়ে এসেছে ছাদ ও বিমে মরীচিকা ধরা রড। সামান্য বৃষ্টিতেই ভবনের ছাদ থেকে চুইয়ে পানি পড়ে কক্ষে। আবার অনেক বিদ্যালয়েই টিনের ঘর। সেগুলো নড়বড়ে অবস্থায় টিকে আছে। এমন দুরবস্থার চিত্র মিলবে দেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলায়।

 

সূত্র জানায়, দ্বিতীয় শ্রেণীর বেশির ভাগ পদেই সরকারি কর্মকর্তারা দশম গ্রেডে বেতন পান। অথচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা পাচ্ছেন ১১তম গ্রেডে। বিসিএস থেকে সুপারিশ পাওয়া প্রার্থীদের নিয়োগ দিতে হলে দশম গ্রেডেই দিতে হবে। কারণ একই সাথে সুপারিশ পাওয়া অন্যান্য দপ্তরের  প্রার্থীরাও এ গ্রেডে বেতন পাবেন। এখন প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেডে বেতন দিতে হলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি পাওয়াসহ নানা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষকদের পদোন্নতিসংক্রান্ত বিধিমালা অনুযায়ী সরাসরি প্রধান শিক্ষক পদে শূন্য আসনের ৩৫ শতাংশ নিয়োগের বিধান রয়েছে। বাকি ৬৫ শতাংশ শূন্য পদে সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে পূরণ করতে হবে।

 

পদটি তৃতীয় শ্রেণীর থাকার সময় সরাসরি নিয়োগ দিত অধিদপ্তর। এখন দ্বিতীয় শ্রেণী হওয়ায় নিয়োগ দিতে হবে পিএসসিকে। কিন্তু তাদের পক্ষে কোনোভাবেই দ্রুততম সময়ে হাজার হাজার প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব নয়। আর হাজার হাজার সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়াটাও পিএসসির পক্ষে দুরূহ ব্যাপার। যদিও প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে দুটি জেলার সব বিদ্যালয়ে চলতি দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। কিন্তু তাতে আরো সমস্যা দেখা দিয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে দুই জেলার প্রতিটি বিদ্যালয় থেকে একজন সহকারী শিক্ষক কমে গেছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে পড়ালেখা।

 

সূত্র আরো জানায়, বেশির ভাগ বিদ্যালয়েই ৪ জন শিক্ষক। তার মধ্যে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। তাকে প্রায় প্রতিদিনই উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনারে অংশগ্রহণসহ নানা প্রশাসনিক কাজ করতে হয়। আবার শিক্ষকদের ৬০ শতাংশ মহিলা হওয়ায় মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ নানাভাবে একজনের ছুটি থাকে। অনেক সময় বাকি একজনকেই চালাতে হয় বিদ্যালয়। ফলে ২/৩টি ক্লাসের শিক্ষার্থীদের একত্র করে পড়াচ্ছেন সহকারী শিক্ষকরা। একটি বিদ্যালয়ে প্রাক-প্রাথমিকের ক্লাসের সময় আড়াই ঘণ্টা। আর প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীতে ৪টি ক্লাস এবং তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ৪৫ মিনিটের ৬টি ক্লাস হওয়ার কথা। কিন্তু ২ জন শিক্ষকের পক্ষে এতো ক্লাস নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

আবার অনেক বিদ্যালয়েই কোনো রকমে দু-একটি ক্লাস করেই ছুটি দেয়া হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাতে সিলেবাস শেষ হচ্ছে না। তাছাড়া অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে ওসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে ২০১২ সালে প্রকল্প নেয়া হলেও জরাজীর্ণ সব ভবন পুননির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। এখন তো প্রকল্পের মেয়াদই ফুরিয়ে গেছে। যদিও জরাজীর্ণ বিদ্যালয়গুলোর নাম নিয়ে তালিকা নিয়মিতই হালনাগাদ করা হচ্ছে। ২০১৩ সালে একযোগে প্রায় ২৬ হাজার রেজিস্টার্ড, স্বীকৃতিপ্রাপ্ত, কমিউনিটি ও এনজিও পরিচালিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়। ওসব বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ ভবনই হয়তো সংস্কার বা পুননির্মাণ করতে হবে। বর্তমানে জরাজীর্ণ ও জরুরি সংস্কার প্রয়োজন এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

এদিকে বিগত ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষকেরই মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাদের বেশির ভাগেরই প্রশিক্ষণ নেই এবং চাকরি হয়েছে পরিচালনা পর্ষদকে টাকা দিয়ে। প্রাথমিকের ৪ লাখ শিক্ষকের মধ্যে ওই জাতীয়করণ বিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা এক লাখের ওপরে। তাছাড়া রেজিস্টার্ড বিদ্যালয়ের জন্য ২০১২ সালে প্যানেল করা ২৮ হাজার শিক্ষকের নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষের পথে। ওসব শিক্ষকের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ফলে মানের দিক দিয়েও পিছিয়ে পড়ছে প্রাথমিক শিক্ষা।

 

অন্যদিকে এমন পরিস্থিতি প্রসঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু হেনা মোস্তফা কামাল জানান, জরুরি ভিত্তিতে জরাজীর্ণ এক হাজার ৪০০ বিদ্যালয়ে ভবন নির্মাণের কাজ শিগগির শুরু হবে। আর আগামী বছরের মধ্যে জরাজীর্ণ সব ভবনের নির্মাণকাজই শুরু হবে। আপাতত সংকট কাটাতে প্রধান শিক্ষক পদে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে চলতি দায়িত্ব দেয়া হচ্ছে। আর সরাসরি নিয়োগ দেয়ার দায়িত্ব পিএসসির। তাছাড়া সহকারী শিক্ষক পদে প্যানেল থেকে ২৮ হাজার শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বাকি নিয়োগপ্রক্রিয়াও নিয়মিত চলছে।

 

নিয়োগের বিষয়ে পিএসসির চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক জানান, পিএসসি যেমন চাহিদাপত্র পায় সেভাবে সুপারিশ করে। যদি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর বড় রিক্যুইজিশন না দেয় তাহলে পিএসসি প্রার্থী দেবে কিভাবে? আর পদোন্নতির কাগজ এলেও পিএসসি আটকে রাখবে না। পিএসসি চায় দ্রুত শূন্য পদ পূরণ হোক। তবে তাদের নিয়োগবিধিতে কিছুটা সমস্যা রয়েছে। মূল উদ্যোগ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কেই নিতে হবে। আর ৩৪তম বিসিএস থেকে প্রধান শিক্ষক পদে যে সুপারিশ গেছে সেটা পিএসসি দ্বিতীয় শ্রেণী হিসেবে দিয়েছে। তবে তারা কোন গ্রেডে বেতন পাবেন তা মন্ত্রণালয় ঠিক করবে।

 

এ প্রসঙ্গে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নজরুল ইসলাম খান জানান, আগে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার। ২০১৩ সালে নতুন করে যোগ হয়েছে আরো ২৬ হাজার। এখন প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য জ্যেষ্ঠতা গণনা করতে হলে সবাইকে নিয়েই করতে হবে। কিন্তু নতুন জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়গুলোর জ্যেষ্ঠতা তালিকা এখনো তৈরি হয়নি। ফলে পদোন্নতি দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। এটা হয়ে গেলেই পিএসসিতে পাঠিয়ে দেয়া হবে। আর সরাসরি নিয়োগের পুরো দায়িত্বই পিএসসির।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ১১:৫০ পূর্বাহ্ণ | আগস্ট ০৮, ২০১৭