|

ময়মনসিংহ থেকে নেত্রকোনা ১৪৬ কিলোমিটার সাঁতার কেটে ক্ষিতিন্দ্রের নতুন রেকর্ড

লোক লোকান্তরঃ  ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার কংস নদের সরচাপুর সেতু থেকে সাঁতার শুরু করে নেত্রকোণার মদন উপজেলা সদরের দেওয়ান বাজারের ঘাটে মগড়া নদী পর্যন্ত সাঁতারে নতুন রেকর্ড গড়লেন ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য। ৬৬ বছর বয়সে আবারো সাঁতারে নেমে ১৪৬ কিলোমিটার নদীপথ বিরামহীনভাবে পাড়ি দিলেন তিনি। এই পথ পাড়ি দিতে তিনি সময় নেন ৪৪ ঘণ্টা। এ সময় নদীর দুই তীরে হাজারো মানুষ কৃতী এই সাঁতারুকে দেখার জন্যে ভিড় জমান।

 

এই সাঁতার আয়োজন করে মদন নাগরিক কমিটি ও ফুলপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।

 

মদন নাগরিক কমিটির সদস্য রফিকুল ইসলাম জানান,  শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ফুলপুর উপজেলার কংস নদের সরচাপুর সেতু থেকে সাঁতার শুরু করেন। রবিবার বেলা দুইটা বেজে এক মিনিটে তখন তিনি নেত্রকোণার মদন উপজেলা সদরের দেওয়ান বাজারের ঘাটে মগড়া নদী থেকে উঠে এলেন ডাঙ্গায়।

 

তিনি জানান, সাঁতার শেষ করার সাথে সাথে সাঁতারু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্রকে  স্থানীয় হেলথ কেয়ারে নেয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়ার পর সুস্থ্য অবস্থায় তিনি উপজেলা সদরের বৈশ্যপাড়ায় নিজ বাড়িতে ফিরেন।

 

এর আগে তিনি  ১৯৮০ সালে  ১২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে ভারতের  মুর্শিদাবাদের ভাগিরথী নদীর জঙ্গীপুর ঘাট থেকে গোদাবরী ঘাট পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার দূরপাল্লার নদীপথ পাড়ি দেন। এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সাঁতারে রেকর্ড গড়েছেন। সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

 

মদন উপজেলা সদরের বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলেন, ক্ষিতিন্দ্র বৈশ্য আমাদের গর্ব। তিনি জীবনের শেষ বয়সে এসেও দূরপাল্লার সাঁতার কেটে দেখালেন ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব।

 

মদন সদরের জাহাঙ্গীরপুর এলাকার ছানোয়ার হোসেন বলেন, ক্ষিতিন্দ্র বৈশ্যের সাঁতার আমাদের জন্যে এক ভিন্নমাত্রার আনন্দ। তার এই সাঁতার ঘিরে দুই জেলার কংস ও মগড়া নদীর দুই তীরে যেন উৎসব হয়ে গেল। সব বয়সী নারী, পুরুষ, শিশুরা ছিলেন আনন্দে উদ্বেলিত।

জাহাঙ্গীরপুর এলাকার আরেক বাসিন্দা নুরুল হক রুনো বলেন, টানা ৪৪ ঘণ্টা সাঁতরেছেন তিনি। মূহূর্তের জন্যেও থামেননি। এ এক অনবদ্য রেকর্ড। ইতিহাসে নাম লেখানোর এই ঘটনায় সাক্ষী থেকে নিজেকে গর্বিত মনে করছি।

 

সাতারু ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্যের বাড়ি নেত্রকোনার মদন উপজেলার জাহাঙ্গীরপুর গ্রামে। তিনি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এএনএস কনসালট্যান্ট হিসেবে অবসর গ্রহণ করেছেন। ১৯৭০ সালে সিলেটের ধুপাদীঘি পুকুরে অরুণ কুমার নন্দীর বিরামহীন ৩০ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনী দেখে তিনি উদ্বুদ্ধ হন। পরে একই বছর মদনের জাহাঙ্গীরপুর উন্নয়ন কেন্দ্রের পুকুরে তিনি ১৫ ঘণ্টার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে আলোচিত হন। যা তার প্রথম সাঁতার প্রদর্শনী। পরবর্তী সময়ে ১৯৭২ সালে সিলেটের রামকৃষ্ণ মিশন পুকুরে ৩৪ ঘণ্টা, সুনামগঞ্জের সরকারী হাইস্কুলের পুকুরে ৪৩ ঘণ্টা, ১৯৭৩ সালে ছাতক হাইস্কুলের পুকুরে ৬০ ঘণ্টা, সিলেটের এমসি কলেজের পুকুরে ৮২ ঘণ্টা এবং ১৯৭৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথহলের পুকুরে ৯৩ ঘণ্টা ১১ মিনিট বিরামহীন সাঁতার প্রদর্শন করে জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করেন। জাতীয় রেকর্ড সৃষ্টি করায় ওই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ডাকসুর উদ্যোগে ক্যাম্পাসে বিজয় মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

 

১৯৭৬ সালে তিনি জগন্নাথ হলের পুকুরে ১০৮ ঘণ্টা পাঁচ মিনিট সাঁতার প্রদর্শন করে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেন। এর স্বীকৃতি হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ জগন্নাথ হলের পুকুর পাড়ে একটি স্মারক ফলক নির্মাণ করা হয়। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে ঢাকা স্টেডিয়ামের সুইমিং পুল, মদন উপজেলা পরিষদের পুকুর এবং নেত্রকোনা পৌরসভার পুকুরে তার একাধিক সাঁতার প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। ভারতেরও দূরপাল্লার সাঁতার প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন তিনি। ১৯৮০ সালে মাত্র ১২ ঘণ্টা ২৮ মিনিটে মুর্শিদাবাদের ভাগিরথী নদীর জঙ্গীপুর ঘাট থেকে গোদাবরী ঘাট পর্যন্ত ৭৪ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দেন। সাঁতার প্রদর্শনী ও রেকর্ড সৃষ্টির স্বীকৃতি হিসেবে অসংখ্য পুরস্কার-সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

 

ক্ষিতিন্দ্র চন্দ্র বৈশ্য বলেন, সিলেট অরুণ নন্দীর একক সাঁতার দেখে আমি সাঁতার প্রদর্শনীতে উদ্দীপনা পেয়েছি। শেরপুর নালিতাবাড়ী থেকে সাঁতার দেয়ার কথা থাকলেও নানা প্রতিকূলতায় ফুলপুর সরচাপুর কংস থেকে সাঁতার শুরু করছি। জীবনে অনেক সাঁতার কেটেছি, এটাই হবে হয়ত আমার শেষ সাঁতার।

 

ছবিঃ সংগৃহীত

সর্বশেষ আপডেটঃ ১১:৫৬ পূর্বাহ্ণ | আগস্ট ০৭, ২০১৭