|

দুশ্চিন্তায় চা বাগানের মালিক ও শ্রমিক

লোক লোকান্তরঃ   অতিবৃষ্টি, উচ্চ তাপমাত্রাসহ নানা প্রাকৃতিক কারণে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন চা বাগানে নতুন কুঁড়ি আসছে না। কোথাও কোথাও কুঁড়ি বের হলেও সংখ্যায় খুবই নগণ্য।

 

এ কারণে চায়ের ভরা মৌসুমে পাতা তুলতে না পেরে উদ্বিগ্ন মালিক ও শ্রমিকরা।

 

বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চলের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর এখন পর্যন্ত বাগানগুলোতে প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন কম হয়েছে।

 

এ পেশায় সংশ্লিষ্টরা জানান, এখন চা পাতা তোলার ভরা মৌসুম। গত বছর এই সময়ে চা শ্রমিকরা নির্ধারিত ওজনের চেয়ে বেশি পাতা তুললেও এবার চিত্র একেবারে ভিন্ন। যে সময়ে একজন শ্রমিকের দৈনিক ৬০ থেকে ৮০ কেজি পাতা তোলার কথা সেখানে এবার ১৫/১৬ কেজির উপরে তুলতে পারছেন না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পাতা তোলা একেবারেই বন্ধ রয়েছে।

 

গত বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার টি এস্টেটের বলিশিরা ভ্যালি গিয়ে কথা হয় কর্মরত বাসন্তী গোয়ালা, প্রতিমা তাঁতীসহ একাধিক শ্রমিকের সঙ্গে।

 

তারা  বলেন, বাগানের বিভিন্ন সেকশনের কোথাও মশার আক্রমণ, কোথাও লাল মাকরসা  আবার কোথাও কোনো কারণ ছাড়াই নতুন কুঁড়ি গজানো বন্ধ রয়েছে।

 

তারা জানান, এই সময়ে তাদের দিনে ৮৫ টাকা হাজিরার জন্য নির্ধারিত ২৪ কেজি পাতা তুলতে হয়। এরপরও তারা পাতা তুলতেন  ৬০ থেকে ৮০ কেজি।  অতিরিক্ত উত্তোলিত পাতার জন্য তারা কেজি প্রতি ৪ টাকা হারে পান। এভাবে দৈনিক আড়াই/তিনশ টাকা আয় করেন; কিন্তু এবার দৈনিক ৮৫ টাকার হাজিরাও ওঠাতে পারছেন না।
চা শ্রমিক সীমা বুনার্জী  বলেন, গতকাল তিনি পাতা তুলেছেন ১৫ কেজি, আর এর জন্য পাবেন ৬০ টাকা। অর্থাৎ দৈনিক হাজিরা ৮৫ টাকাও পাচ্ছেন না।

 

এ বিষয়ে বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট অঞ্চেলের চেয়ারম্যান জিএম শিবলী বলেন, বৃষ্টি ছাড়া চা উৎপাদন যেমনি সম্ভব নয় তেমনি অতিবৃষ্টি চায়ের জন্য ক্ষতিকর। অতিবৃষ্টিতে সেকশনের উপরের মাটি ধুয়ে যায়। এছাড়াও অতিরিক্ত তাপমাত্রাও চায়ের জন্য খুব ক্ষতিকর। এ বছর সর্বোচ্চ তামমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে।
তবে এ থেকে উত্তরণের জন্য বাগান কর্তৃপক্ষকে রোগবালাই দমনের সঠিক প্রকৃয়া মেনে চলার পরামর্শ দেন বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক মোহাম্মদ আলী।

 

এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রত্যেক চা বাগানের ব্যবস্থাপকসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়মমাফিক পানি নিষ্কাশন ও ওষুধ ব্যবহারেরও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

 

মোহাম্মদ আলী বলেন, এ বছর চা মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি পাওয়া যায়নি। পরে যে বৃষ্টি পাওয়া গেছে তা মাত্রাতিরিক্ত, যা উপকারের চেয়ে ক্ষতি করেছে বেশি। অত্যধিক বৃষ্টির কারণে পানি জমে গাছের বৃদ্ধি কমে যায়।

 

“আর ২৮ ডিগ্রির উপরে তাপমাত্রা হলে গাছের বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যায়। এ বছর বেশিভাগ সময়েই তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল। আর এ অনিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার কারণে বিভিন্ন সেকশনে চা পাতা গজানো বন্ধ হয়ে আছে।”
এছাড়া প্রকৃতিতে এ অবস্থা হলে চা বাগানে চায়ের মশা ও লাল মাকরশা বেড়ে যায়। লাল মাকরসায় আক্রমণের ফলে পাতা লালচে হয়ে যায়। তখন পাতা যে পরিমাণ খাদ্য তৈরি করা কথা তা করতে পারে না। ফলে নতুন কুঁড়ি বের হওয়া বন্ধ হয়ে যায় বলে তিনি জানান।

 

আর মশা পাতার সবুজ অংশ খেয়ে ফেলে বলে জানান মোহাম্মদ আলী।

 

তিনি বলেন, তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে গেলে একটি মাকরসা বংশবৃদ্ধি করে বাচ্চা পরিপূর্ণ করা পর্যন্ত ১৫ দিনের স্থলে সাত দিনেই তা সম্পন্ন হয়। এতে এর উপদ্রব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আর গত তিনদিন ধরে চা বাগান এলাকায় তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে ওঠা-নামা করেছে।

 

“আবার সূর্যালোক যদি কমে যায়, আর্থাৎ দীর্ঘক্ষণ মেঘলা আবহাওয়া থাকলে  মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তখন তারা নতুন কুঁড়ি খেয়ে ফেলে। এটাই হচ্ছে এ বছর কাক্সিক্ষত উৎপাদনের  প্রধান অন্তরায়।”

 

এ সময় করণীয় হিসেবে তার পরামর্শ হলো, সার দেওয়ার পর পর বৃষ্টি হলে সার ধুয়ে যায়। তাই বিষয়টি লক্ষ রেখে পুনরায় সার দিতে হবে। অতিবৃষ্টি হলে অনেক সময় পানি জমে যায়। তাই সব সময় ড্রেন পরিষ্কার রাখতে হবে। সেকশন ফ্লাড এলাকায় হলে ক্রস ড্রেন করতে হবে।

 

রেড স্পাইডারের জন্য যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় তা পাঁচ দিন অন্তর অন্তর দিলে ভালো হয়। আর মশার জন্য রেনুভা ব্যবহার করলে ভালো হয়। তবে একই ওষুধ বার বার ব্যবহার না করে পরিবর্তন করারও পরামর্শ দেন তিনি।
এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল এম আর খান চা বাগানের মালিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বলিশরা ভেলিতে তার দুটি চা বাগানে নন্দ রানী ও এমআর খান-এ কোনো কারণ ছাড়াই কুঁড়ি আসছে না। অনেক সেকশনে মাকরসা বা মশার উপদ্রব নেই; তবুও কুঁড়ি নেই।

 

তাই এ বছর লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে তারা সংশয়ে আছেন বলে জানান সিরাজুল।

 

এ ব্যাপারে শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের পর্যবেক্ষক হারুন-অর-রশিদ বলেন, বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় মৌলভীবাজারের তাপমাত্রা  ছিল  ৩৩ দশমিক ৪  ডিগ্রি সেলসিয়ার, আর বুধবার ছিল ৩৬ দশমিক ৪ ডিগ্রি।
জুন মাসের প্রথম সাপ্তাহে তারা  বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছেন ৩৩২ মিলিমিটার। আর মে মাসে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছিলেন ৩৫৫  মিলিমিটার। এ দুটিই চায়ের জন্য ক্ষতিকর বলে জানান হারুন।

সর্বশেষ আপডেটঃ ৫:৫৬ অপরাহ্ণ | জুন ১২, ২০১৭