|

কোটার ফাঁদে বিসিএস! ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়ার দাবি

লোক লোকান্তরঃ  প্রথম শ্রেণির সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে কোটায় বেশি নিয়োগ নিয়োগ দিয়ে থাকে সরকার। বিপুল সংখ্যক মেধাবী প্রার্থীর চেয়ে স্বল্প সংখ্যক কোটাধারীদের কারণে অধিকতর মেধাবী হওয়া সত্ত্বের কাঙ্খিত চাকরি পাচ্ছে না দেশের হাজারো তরুণ-তরুণী।

 

২৯ মার্চ মঙ্গলবার দৈনিক যায় যায় দিন পত্রিকায় ‘কোটার ফাঁদে বিসিএস!’ শিরোনামে প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে পাশাপাশি গত ২০ মার্চ সোমবার ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ময়মনসিংহ বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

 

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়- বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশসহ নারী, জেলা, উপজাতি ও প্রতিবন্ধীদের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত আছে। বিসিএস পরীক্ষায় এসব কোটার প্রার্থী পাওয়া না গেলে ওইসব পদ খালি রাখতে ২০১০ সালে নির্দেশনা দেয় সরকার। এরপর ২৮ থেকে ৩৪তম বিসিএস পর্যন্ত এসব কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ার কারণে ৫ হাজার ৬০৬টি পদ খালি রয়েছে।

 

অথচ এত পদ খালি থাকার পরও বিসিএস পাস করে নিয়োগ পাননি কয়েক হাজার মেধাবী। এ পরিস্থিতিতে গত ২০ ফেব্রুয়ারি ৩৫তম বিসিএসে মুক্তিযোদ্ধা, নারী ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটায় পূরণ না হওয়া ৩৩৮টি পদ ৩৬তম বিসিএসের মেধাতালিকা থেকে পূরণের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
তবে বিসিএসের মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্যান্য কোটা মেধাবীদের দিয়ে পূরণের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন কোটা প্রার্থীরা। এজন্য পিএসসির চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবি করেছেন ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ নামের একটি সংগঠন।

 

অথচ ২৮তম বিসিএসে ৮২১টি, ২৯তম বিসিএসে ৮১৬টি, ৩০তম বিসিএসে ৮০৩টি, ৩১তম বিসিএসে ৮১১টি পদে বিভিন্ন কোটায় প্রার্থী না পাওয়ার ফলে শূন্য ছিল। কোটার শূন্য পদগুলো পূরণ করতে মুক্তিযোদ্ধা, আদিবাসী ও নারীদের জন্য ৩২তম বিশেষ বিসিএস নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। ওই বিসিএসেও এক হাজার ১৩০টি পদ শূন্য রাখতে হয়। শেষপর্যন্ত ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে তা পূরণের সিদ্ধান্ত হয়। অথচ ৩২তম বিসিএসে উত্তীর্ণ ৯১২ জনই চাকরির সুযোগ পাননি। কারণ এক কোটা থেকে আরেক কোটায় নিয়োগ দেয়া যায় না। এ ছাড়া ৩৩তম বিসিএসে ৫০২টি, ৩৪তম বিসিএসে ৭২৩টি শূন্য রয়েছে।

সরকারি কর্মকমিশনের কার্যালয়। ফাইল ছবি

 

৩৪তম বিসিএসে উত্তীর্ণ সুপারিশ বঞ্চিত সাবিনা আক্তার নামে এক প্রার্থী বলেন, ‘বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় পাস করার জন্য তথা মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হওয়ার জন্য প্রতি বিষয়ে কমপক্ষে ৫০ শতাংশ নাম্বার পেতে হয়। অথচ আমি প্রতি বিষয়ে ৬০ নাম্বার পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলাম এরপরও কোনো ক্যাডারে নিয়োগের জন্য পিএসসি আমাকে সুপারিশ করেনি। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটার এক প্রার্থী প্রতি বিষয়ে ৫০ নাম্বার পেয়ে প্রশাসন ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। এ ছাড়া কোটাধারীদের মধ্যে যোগ্য প্রার্থী না থাকায় আরও ৭২৩ পদ শূন্য রয়েছে। আর আমরা এত বেশি নাম্বার পেয়েও কোনো ক্যাডারে নিয়োগ পাইনি।’

 

সাবিনা আক্তারের মতো সুপারিশ বঞ্চিত আরও অনেকেই একই সুরে এ অভিযোগ করেছেন।
এ বিষয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক বলেন, কোটা সংরক্ষণের নিয়ম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিথিলের সুপারিশ করেছে পিএসসি। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বাতিল বা সংস্কারের কোনো সুপারিশ করেনি। তিনি বলেন, যেসব বিসিএস পরীক্ষায় কোটা পূরণ হয় না, সেসব পদ শূন্য থাকে। জনবল না থাকায় দেশের মানুষ সরকারের সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। এসব শূন্যপদ পূরণের জন্য বিশেষ বিসিএসের আয়োজন করতে অনেক সময় লেগে যায়। এ কারণে পিএসসি কোটা সংরক্ষণের নিয়ম নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিথিলের সুপারিশ করেছে।

 

পিএসসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সরকারের বিভিন্ন কমিটি ও কমিশন একাধিকবার বর্তমান কোটা পদ্ধতি সংস্কারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করেছে সরকারকে। পাশাপাশি এ সংস্কার ইস্যুতে রাজপথসহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলনও হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি কোনো সরকারই।

ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন। লোক লোকান্তর

এ ছাড়া কোটা পদ্ধতির সংস্কারের জন্য পিএসসি বার্ষিক প্রতিবেদনে একাধিকবার সুপারিশ করে। এমনকি কোটা নিয়ে পিএসসি একটি মৌলিক গবেষণাও করেছিল। সেটি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে জমাও দেয়া হয়। কিন্তু কোনো অগ্রগতি হয়নি। এছাড়া বর্তমানে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ও জেলাগুলো ছোট হওয়ায় আগের মতো প্রকট বৈষম্য নেই। তাই জেলা কোটা তুলে দিয়ে মেধা কোটা আরও ১০ ভাগ বাড়ানো যেতে পারে। এতে মেধাবীরা উপকৃত হবে।

 

বিসিএসের মুক্তিযোদ্ধা কোটা মেধাবীদের দিয়ে পূরণের সরকারের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি জানিয়েছে ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান’ নামের একটি সংগঠন। তারা ইতোমধ্যে বিবৃতি, সারাদেশে মানববন্ধন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে। বিসিএসসহ সরকারি চাকরির সব ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের দাবি জানিয়ে সংগঠনের নেতারা বলেছেন, আইন অনুযায়ী কোটা পূরণ না হলে সিটগুলো খালি রেখে প্রয়োজনে দুই-তিন বিসিএস মিলে অপূরণীয় সিটগুলো নিয়ে স্পেশাল বিসিএস এর ব্যবস্থা করতে হবে।

 

এ ছাড়াও বিসিএসসহ সব চাকরির ক্ষেত্রে সাধারণ প্রার্থী ও কোটাধারীদের ফল আলাদাভাবে প্রকাশ, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কোটায় চাকরি প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য আলাদা বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। জানা যায়, সরকারি চাকরিতে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রার্থীদের জন্য ৫ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত থাকলেও বিসিএসের নিয়োগে ৮৭ শতাংশ পদই পূর্ণ হয় না। ফলে কোটা সংরক্ষণের প্রকৃত সুবিধা পেতে বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরীক্ষার্থীদের জন্য শর্ত শিথিলের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কোটার পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতে প্রয়োজনে আইনের পরিবর্তন করতে হবে। এসব জাতির মানুষ রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে অনেক ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়টি অনুধাবন করতে হবে।

ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন। লোক লোকান্তর

আবার ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ময়মনসিংহ বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

 

২০ মার্চ সোমবার বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত মানববন্ধনটি অনুষ্ঠিত হয়। পরে একই দাবিতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা।

 

মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীদের দাবি, ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ময়মনসিংহ বাদে দেশের বাকি সাতটি বিভাগে বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। অথচ বিভাগ প্রতিষ্ঠার এত দিনেও ময়মনসিংহে বিসিএস পরীক্ষার কেন্দ্র দেওয়া হচ্ছে না।

 

এতে ঢাকায় গিয়ে ময়মনসিংহ বিভাগের শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা ও ময়মনসিংহ জেলার শিক্ষার্থীদের বিসিএসের প্রিলিমিনারি (প্রাথমিক বাছাই) ও লিখিত পরীক্ষায় অংশ নিতে হচ্ছে। এতে চাকরিপ্রত্যাশীদের আর্থিক ক্ষতিসহ নানা ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

 

ছবিঃ লোক লোকান্তর

সর্বশেষ আপডেটঃ ১০:২৮ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ২৮, ২০১৭