|

ভোক্তা অধিকার ও খাদ্য নিরাপত্তা আইন

লোক লোকান্তরঃ  বেঁচে থাকার জন্য যে সব বিষয়ের উপর নির্ভর করতে হয় ও বিশ্বাস রাখতে হয় তা হচ্ছে খাবার যোগ্য খাদ্য। কিন্তু সে খাবারটিই যদি হয় বিষাক্ত বা ভেজাল অথবা আপনার শারীরিক ক্ষতির যোগ্য তবে সভ্যতা অগ্রগামী বলা যায় না। অথবা যে পণ্যটি আপনার জীবনকে সহজ করে দেয়ার জন্য ব্যবহার করতে চান, বা আপনার কাছে সরবরাহ করা হচ্ছে তা যদি হয় ত্রুটিপূর্ণ বা অসংগতিময় অথবা আপনাকে ঠকানোর জন্য নকল করা তবে ভোক্তা হিসেবে কি মূল্য থাকছে আপনার?

 

ভোক্তা বলতে আমরা বুঝি, যিনি ভোগ করেন বা উপভোগকারী। কিন্তু উপভোগের সামগ্রী গুলো যদি হয় ভেজাল, পরিমাপে ঠকানোর ধান্ধা, নকল পণ্য, অবহেলায় উৎপাদিত ও মেয়াদ উত্তীর্ণ, আপনার নিরাপত্তা ও জীবনবিপন্নকারী তবে নিশ্চিত ভাবেই তা আপনার জন্য উপভোগের হবে না। আর তা বন্ধে এবং ভোক্তা বা ক্রেতার অধিকার সংরক্ষিত ও বলবৎ করনে, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ পাশ হয়েছিল।

 

মিস আইশা টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে দেখলাম, ওমুক কো¤পানির  রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ত্বকে মাখলে  তিন মাসের মধ্যে ত্বক ফর্সা ও উজ্জল হয়ে উঠবে। তিনি বাজার থেকে সেই কো¤পানির পণ্য ক্রয়ের পর টানা তিন মাস ব্যবহারের পরেও কোন ফল পেলেন না। উল্টো তার ত্বকে বিভিন্ন ধরনের দাগ ও চর্ম রোগে আক্রান্ত হলেন। এই ক্ষেত্রে তিনি ভোক্তা অধিকার আইন অনুযায়ী প্রতিকার পেতে পারেন। ভোক্তা অধিকার আইনের ৪৪ ধারা অনুযায়ী, মিথ্যা ও অসত্য বিজ্ঞাপনের দ্বারা ক্রেতাকে প্রতারিত করা দন্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। একই সাথে এই আইন অনুযায়ী, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর পণ্য সামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রয়ের উপর নিষেদাজ্ঞা আরোপের বিধান রয়েছে।

 

ভোক্তা অধিকার আইন স¤পর্কে ক্রেতা-বিক্রেতা, উৎপাদন ও সরবরাহকারী সকলের সজাগ দৃষ্টি ও আইন অনুযায়ী কাজ করা উচিত, যদিও আইনের প্রয়োগ ও অসচেতনতায় আইন বন্ধী হয়ে আছে।

 

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের বিশেষ কিছু অংশ, কোন ব্যক্তি কোন আইন বা বিধি দ্বারা কোন পণ্য মোড়কাবদ্ধভাবে বিক্রয় করিবার এবং মোড়কের গায়ে সংশি¬ষ্ট পণ্যের সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয় মূল্য, উৎপাদনের তারিখ, প্যাকেটজাতকরণের তারিখ এবং মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ ¯পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করিবার বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করিয়া থাকিলে তিনি অনূর্ধ্ব এক বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদন্ডে, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। যা বলা আছে এই আইনের ৩৭ নম্বর ধারায়। গ্রাহক বা ভোক্তার দায়িত্ব সবকিছু দেখে পণ্য ক্রয় করা। সচেতনতা গ্রাহকের শক্তি। পণ্যের মূল্য ও সেবার মূল্যের তালিকা প্রদশর্ণ ও অধিক মূল্য গ্রহণ দন্ডনীয়। ভেজাল ও নকল পণ্য উৎপাদন বিক্রয় শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। ওজনে কারচুপি, পরিমাপে কম দেয়া, ভুল বাটখাড়া ব্যবহার দন্ডনীয় অপরাধ যার শাস্তি এক বছর কারাদন্ড বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দন্ড হতে পারে।

 

মানুষের জীবন বা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্বকভাবে ক্ষতিকারক কোন দ্রব্য, কোন খাদ্য পণ্যের সহিত যাহার মিশ্রণ কোন আইন বা বিধির অধীন নিষিদ্ধ করা হইয়াছে, কোন ব্যক্তি উক্তরূপ দ্রব্য কোন খাদ্য পণ্যের সহিত মিশ্রিত করিলে তিনি অনূর্ধ্ব তিন বৎসর কারাদন্ড, বা অনধিক দুই লক্ষ টাকা অর্থদন্ড, বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন। তবে এর ফলে মৃত্যুবরণ করলে শাস্তির কোন তারতম্য এই আইনে ব্যাখা করা হয় নি। সেবা গ্রহীতার জীবন বা নিরাপত্তা বিপন্নকারী কার্য করিবার ও অবহেলা, ইত্যাদি দ্বারা সেবা গ্রহীতার অর্থ, স্বাস্থ্য, জীবনহানি, ইত্যাদি ঘটালেও একই দন্ডের বিধান রয়েছে।

 

এই আইনের সবগুলো ধারা জামিনযোগ্য হওয়ায়, সংশি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠান সাময়িক ভাবে পার পেয়ে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হয়ে থাকে যদিও শাস্তি সময় সাপেক্ষ ও পণ্যের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা নির্ভরশীল কিছু সরকারী প্রতিষ্ঠানের উপর, যারা শ¬¬থগতির।

 

প্রশ্ন করতে পারেন এই আইন অনুযায়ী অভিযোগ করবেন কোন প্রতিষ্ঠানে বা কার কাছে। যিনি, সাধারণভাবে একজন ভোক্তা বা ভোক্তা হতে পারেন, এই আইনের অধীন ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কার্য স¤পর্কে মহাপরিচালক বা এতদুদ্দেশ্যে মহাপরিচালকের নিকট হতে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অবহিত করে লিখিত অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। অথবা এই আইনের ধারা অনুযায়ী আদালতে বা বিশেষ ট্রাইব্যুনালে নিয়মিত ফৌজদারী মামলা দায়ের করতে পারবেন। তবে আশার কথা এই আইন অনুযায়ী বিচারের পর আরোপিত জরিমানার অর্থ আদায় হয়ে থাকলে উক্ত আদায়কৃত অর্থের ২৫ শতাংশ তৎক্ষণিকভাবে উলি¬খিত অভিযোগকারীকে প্রদান করতে হবে যা বলা আছে আইনের ৭৬ নম্বর ধারায়। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার আইনের দন্ড ভ্রাম্যমান আদালতের হাতেও প্রদান করা হয়েছে। আপনার অভিযোগ লিখিত ভাবে আপনার জেলায় ভোক্তা অধিকার আইনের মাধ্যমে গঠিত অফিসেও প্রদান করতে পারবেন। সরাসরি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে ভেজাল খাদ্য তৈরি, সরবরাহসহ এ ধরনের অপরাধের বিচার হয়ে জরিমানা অনাদায়ে কারাদন্ড প্রদান করা হয়ে থাকে।

 

 

নিজেদের অধিকার রক্ষায় নিজেদের জীবনের তাগিদে নিজেদের এগিয়ে আসতে হবে। পণ্য ও খাদ্যে ভেজাল বন্ধ, উৎপাদকদের লোভ ও অবহেলা, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি বন্ধে সোচ্চার হয়ে আইনের ব্যবহারে অগ্রণী হওয়ার বিকল্প নেই। বিএসটিআই এর চূড়ান্ত ক্ষমতার আওতায় পড়ে যে কোন খাদ্য সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান কে সিলাগালা করে দেওয়া। তবে কেন আবার কিছুদিন পর সেই বন্ধ প্রতিষ্ঠান আবার মাথা তুলে ব্যবসায় দাঁড়ায় তার দায়িত্বও তাদের নিতে হবে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং খাদ্য নিরাপত্তা আইন, ২০১৩ উৎপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে, ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন, ২০০৯, বিএসটিআই অধ্যাদেশ, ২০০৩ ও বিশুদ্ধ খাদ্য অধ্যাদেশ, ২০০৫। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ক্ষমতা বৃদ্ধি এই আইন প্রয়োগে করতে পারে বিপুল পরিবর্তন। মনোবিজ্ঞানিদের মতে ভেজাল খাদ্য ও ক্ষতিকর খাদ্য উৎপাদন অসুস্থ মনের মানুষের কাজ । মানুষের ন্যুনতম বোধ শক্তি থাকলে ও সভ্য হলে পারে না অন্যের ক্ষতির জন্য খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ করতে।

 

খাদ্যে ভেজাল মিশানোর দায়ে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ করা হয়েছে। খাদ্যের ভেজাল প্রতিরোধ ও নিরাপদ খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিতকরণ লক্ষ্যে একটি কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন বিধান করা হয়েছে এই আইনে। ১৯৫৯ সালের পিউর ফুড অর্ডিনেন্স রহিত করে বর্তমান এই আইনটি করা হয়েছে। আইনে উৎপাদনকারী, মোড়ককারী, বিতরণকারী, পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের দায়বদ্ধতা এবং অপরাধের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। যা ভোক্তা অধিকার আইনকে আরও শক্তিশালী করেছে বলা যায়। খাদ্যে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর অথবা বিষক্রিয়া সৃষ্টিকারী রাসায়নিক দ্রব্য বা তার উপাদান বা বস্তু যেমন ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ফরমালিন, সোডিয়াম সাইক্লামেট, কীটনাশক বা বালাইনাশক, সুগন্ধি ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য বা খাদ্যোপকরণে ব্যবহার নিষিদ্ধ করে অমান্যকারীর জন্য সর্বোচ্চ ৫ বছরের এবং অন্যূন ৪ বছরের কারাদন্ড বা অনূর্ধ্ব ১০ লাখ টাকা, অন্যূন ৫ লাখ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আশার কথা এই আইনের কিছু ধারা অজামিনযোগ্য ও বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার যোগ্য।

 

আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন বাস্তবে প্রয়োগ না করতে পারলে ভোক্তাদের অধিকার সফল হবে না। তবে ভেজাল খাদ্যের ফলে মৃত্যু হলে শাস্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবতজীবন নয়। যদিও আইনের খসড়ায় মৃত্যুদন্ড রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।
বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত প্রতিষ্ঠা, খাদ্যে ভেজাল নিরুপণ পদ্ধতি সহজলব্য করা, সংশি¬ষ্ট প্রতিষ্ঠানের নজরদারি বৃদ্ধি করা উচিত। সর্বোপরি, জনগণের আইন, এর সঠিক ব্যবহার ও সচেতনতা নির্ভর করছে তাদের উপর। চাই ভেজাল মুক্ত নিরাপদ খাবার ও নিজের উপভোগের অধিকার নিশ্চিত এবং নিরাপদে উপভোগের স্বাধীনতা।

লেখক:
-মতিউর রহমান ফয়সাল
আইনজীবী ও কলাম লেখক

সর্বশেষ আপডেটঃ ৫:২৪ পূর্বাহ্ণ | মার্চ ১৬, ২০১৭