|

সর্বশেষ

ধোবাউড়ার সোনার মেয়েরা দেশের মুখ উজ্জল করলেও এদের ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হয়নি

 

মতিউল আলম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৬, শনিবার
বাংলাদেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের কমবেশি এখন সবাই চিনে কলসিন্দুর নামের গ্রামটাকে। ময়মনসিংহের সীমান-বর্তী এই গ্রামের অদম্য কিছু কিশোরীই বাংলাদেশের ফুটবলকে এনে দিয়েছিল আন-র্জাতিক সাফল্য। গত বছর এএফসি অনূর্ধ্ব-১৪ টুর্নামেন্টের আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপাজয়ী দলের ১০ জনই ছিল এই কলসিন্দুরের মেয়ে। কয়েক দিন আগে শেষ হওয়া এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল বাছাইপর্বেও চ্যাম্পিয়ন শিপ অর্জন করেছে। এই দলের ৯জন খেলোয়াড়ই উঠে এসেছে কলসিন্দুর গ্রাম থেকে। কলসিন্দুরের এই ফুটবল কন্যাদের সাফল্যের কথা সবার মুখে মুখে থাকলেও অনেকেই জানেন না তাদের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের কথা।

ধোবাউড়া উপজেলা সদর থেকে আরো ১০ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে যেতে হয় কলসিন্দুর গ্রামে। ময়মনসিংহ থেকে দুরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার। সেই অজপড়াগাঁওয়ের কলসিন্দুর স্কুল থেকেই কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেদের তৈরি করেছে এই ফুটবলাররা। তাদের মধ্যে অনেকেই দিন কাটাতে হয়েছে অনাহারে-অর্ধাহারে। তবে কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি মার্জিয়া, নাজমাদের অদম্য ইচ্ছের সামনে। আজ তাদের গৌরবগাঁথার অংশীদার পরিবার, এলাকাবাসীসহ পুরো দেশের মানুষ। তবে কলসিন্দুরের এই ফুটবল কন্যাদের দারুণ সাফল্যে পরিবার ও শুভাকাঙ্খীদের মধ্যে গৌরবের পাশাপাশি ক্ষোভের মাত্রাটাই কম নয়।

কারণ দারুণ ফুটবল খেলে পুরো দেশের নাম উজ্জ্বল করলেও নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেনি কেউই। এখনো রিকশা চালাতে হচ্ছে মার্জিয়া খাতুনের বাবা মোতালিবকে। চায়ের দোকানদারী করে জীবিকা নির্বাহ করতে হয় নাজমার বাবা আবুল কালামের। তাসলিমার বাবা সবুজ মিয়া সবজি বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন। কৃষিকাজ করছেন মারিয়ার মা এনতা মান্দা। অনেকের মনেই ঘুরছে একটা প্রশ্ন : দেশের জন্য এত গৌরব বয়ে আনা ফুটবল কন্যাদের পরিবারে স্বচ্ছলতা আসছে না কেন? সরকার ও দেশ তাদেরকে কী দিয়েছে, এমন প্রশ্ন ছিল অনেকের কণ্ঠে। তাদের ভাষায়, যারা ফুটবল খেলে দেশের জন্য এত গৌরবময় সম্মান বয়ে আনল তারা কী পেল?
মার্জিয়ার বাবা মোতালিব কিছুটা আক্ষেপ নিয়েই বলেছেন, ‘তার মেয়ে (মার্জিয়া) খাওয়া দাওয়াসহ সব কিছুই আলাদা করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হয়। সে খেলার জন্য অনেক পরিশ্রম করে। kolsindur-pic-1-copyকিন’ সে অনুযায়ী তাকে খেতে দিতে পারি না।’ পরিসি’তির উন্নয়নের জন্য সরকারের কাছে আলাদা করে কিছু দাবি করেননি মোতালিব। তবে দেশের নাম উজ্জ্বল করা এই ফুটবলারদের জন্য সরকার নিজ উদ্যোগেই কিছু করবে এমনটাই আশা মার্জিয়ার বাবার। নাজমার বাবা আবুল কালামও সুর মিলিয়েছেন মোতালিবের সঙ্গে। তিনি বলেছেন, ‘আমরা সরকারের কাছে কী চাইয়াম? মেয়েরা বিদেশে দেশে চ্যাম্পিয়ন অইছে। সরকার ইচ্ছা করলেই দিতে পারে। মেয়েরার বাপের তো কিছুই নাই। সবাই দিনমজুর গরিব। আমি দিন আনি দিন খাই, চা দোকান করি।’ অন্যতম খেলোয়াড় মারিয়া মান্দা বাবা মৃত বীরেন্দ্র মারাক মা এনতা মান্দা একজন কৃষি শ্রমিক। মাকে কৃষকের ৰেতে খামারে কাজ করে লেখাপড়া খরচ সহ ডাল-ভাতের টাকা যোগাড় করতে হয়। বসবাসের মতো তাদের ভাল কোন বসত ঘর নেই। শিউলী আজম পিতা নিকুঞ্জ হাউই মা বাসনা আজিম তারাও কৃষি শ্রমিক। মাহমুদার বাবা নবী হোসেন একজন বর্গাচাষী। শামসুন্নাহার তার মিরাশ উদ্দিন ফেরী করে পোনা মাছ বিক্রি করে। তহুরা খাতুন পিতা ফিরোজ মিয়া একজন কৃষক। সানজিদা পিতা লিয়াকত আলী একজন কৃষক। এলাকার বাসিন্দা হাজী লিয়াকত আলী বলেন, মেয়েরা যেমন দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। তেমনি মেয়েদেরকে মর্যাদা দেয়া প্রয়োজন। মেয়েদেরকে ঢাকা থেকে সরাসরি বাড়ি পৌছে দিলে মেয়েদের মর্যাদা বাড়িতো। অনেকের বসবাসের মতো কোন ঘর নেই। এদেরকে বাসস’ানের ব্যবস’া, ভালভাবে লেখাপড়া করার মাসে একটা অনুদানের ব্যবস’া করার দাবী জানান। স’ানীয় কোচ ও কলসিন্দুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিৰক মফিজ উদ্দিন বলেন, যেসব মেয়েরা ভাল খেলছে। তাদেরকে আরো যত্ন নেয়া প্রয়োজন। নিয়মিত উন্নত প্রশিৰণ দিলে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে বলে তার বিশ্বাস। ভাল খেলোয়াড় বের করে আনার জন্য কলসিন্দুর ফুটবল একাডেমী করার দাবী জানান।
এলাকাবাসীর কণ্ঠেও শোনা গেছে ক্ষোভ আর নানা দাবির কথা। তারা কলসিন্দুরের এই ফুটবল কন্যাদের জন্য উন্নত শিৰা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার সুযোগ, বৃত্তি প্রদান, বাসস’ানের দাবি করেছেন সরকারের কাছে। বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নয়নের জন্য এ রকম তৃণমূল পর্যায়ের খেলোয়াড়দের নানাবিধ সহযোগিতা দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন মার্জিয়া-নাজমাদের কোচ মফিজুর রহমান। তিনি কিছুটা আক্ষেপের সঙ্গেই বলেছেন, ‘মেয়েরা বিদেশ থেকে খেলে আসার পর তাদের হাতে সাড়ে ছয় হাজার করে টাকা দেওয়া হয় বাড়ি ফেরা ও হাত খরচের জন্য। যারা সারা বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে তাদের জন্য আরো ভালো কিছু করা দরকার।’

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৩:২৮ অপরাহ্ণ | সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৬