|

সর্বশেষ

নতুন বাজার খোঁজার পাশাপাশি পণ্য বহুমুখিকরণে ব্যবসায়ীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আহবান

 ঢাকা, ২৮ আগস্ট ২০১৬ (বাসস): প্রধানমন্ত্রী দেশের রপ্তানী খাতকে সমৃদ্ধ করার জন্য ব্যবসায়ীদের নতুন বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি পণ্য বহুমুখিকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা নতুন নতুন বাজার খুঁজে বেড়ান। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা সেটা বিশ্লেষণ করে বাজার খোঁজ করুন। বাজার নিজেদের খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সবরকমের সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু বাজার খোঁজার উদ্যোগটা আপনাদেরই নিতে হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে এসে ভাল লাগল, এখন অনেক নতুন নতুন পণ্য বিদেশে রপ্তানী হচ্ছে। তবে, এর পরিমাণটা বাড়াতে হবে। কারণ পৃথিবীতে এখন বহু দেশ এবং মানুষের চাহিদাও দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা আপনাদের খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য পণ্যের বহুমুখিকরণও একান্তভাবে প্রয়োজন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত জাতীয় রপ্তানি ট্রফি বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. তাজুল ইসলাম চৌধুরী, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হেদায়েত উল্লাহ আল মামুন, এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা বক্তৃতা করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ব্যবসায়ীরা ব্যবসা করবেন। সরকার এখানে ব্যবসা করতে আসেনি। আমরা সব ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের সার্বিক অগ্রগতির মাধ্যমে দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার যেন দ্রুত উন্নতি হয় সেই লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। এ সময় বিগত ৭ বছরে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা ব্যবসা ক্ষেত্রে তাঁর সরকার নগদ সহায়তা প্রদান করেছে বলে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আপনারা নতুন নতুন বাজার খুঁজে বেড়ান। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা সেটা বিশ্লেষণ করে বাজার খুঁজুন। বাজার নিজেদের খুঁজে বের করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সবরকমের সহযোগিতা করা হবে। কিন্তু বাজার খোঁজার উদ্যোগটা আপনাদেরই নিতে হবে।’
তিনি বলেন, পৃথিবীতে এখন বহু দেশ এবং মানুষের চাহিদাও দিন দিন পরিবর্তিত হচ্ছে। কোন দেশে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা আপনাদের খুঁজে বের করতে হবে। এজন্য পণ্যের বহুমুখিকরণও একান্তভাবে প্রয়োজন।
সীমিত পণ্যের উপর দেশের রপ্তানি নির্ভরতা দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের অন্যতম দুর্বলতা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বাণিজ্যের এ সমস্যা দূর করার জন্য আমরা পণ্য তালিকায় নতুন নতুন পণ্যের সংযোজন এবং কম অবদান রাখছে এমন পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে আমরা সারাদেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। ইতোমধ্যে ১০টির কাজ এগিয়ে চলছে।
সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় পণ্য ও বাজার বহুমুখী করার ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অধিক মূল্য সংযোজিত পণ্য উৎপাদনে ও দেশজ কাঁচামাল নির্ভর রপ্তানি পণ্য উৎপাদনে আপনাদের মনোনিবেশ করার অনুরোধ জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন বিশ্বের উন্নত দেশ এমনকি উন্নয়নশীল দেশে শ্রমশক্তির প্রকট অভাব। এজন্য আমরা শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠার উপর গুরুত্ব প্রদান করেছি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনশক্তি অর্থনৈতিক সম্পদ। এদেশের ৭৩ শতাংশ মানুষ ৪০ বছর বা তার চেয়ে কম বয়সী। বয়স্ক মানুষের সংখ্যাধিক্যতা এবং কর্মঠ মানুষের ঘাটতির কারণে শ্রমঘন শিল্পে বিশ্বের শক্তিশালী দেশসমূহ ক্রমাগত পিছিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ যাতে সেই জায়গা পুরণ করতে পারে তার জন্য আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের রপ্তানি খাতের শ্লোগান হচ্ছে ‘ফ্রম শার্ট টু শিপ,’ বলেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে ২০১১-১২ ও ২০১২-১৩ অর্থবছরে রফতানি বাণিজ্যের বিকাশে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা পর্যায়ে ১১৩টি প্রতিষ্ঠানের মাঝে জাতীয় রফতানি ট্রফি প্রদান করেন।
২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরের জন্য সর্বমোট ৫২টি স্বর্ণ, ৩৭টি রৌপ্য এবং ২৪টি ব্রোঞ্জ ট্রফি ও সনদ প্রদান করা হয়।

২০৪১ সালকে লক্ষ্য ধরে রপ্তানি উন্নয়নে রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানি বিষয়ে সামগ্রিক সহায়তা প্রদান ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতে দু’টি করে উইং’সহ মোট ২১টি বাণিজ্যিক উইং কার্যকর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে এবং সিঙ্গাপুরে দু’টি নতুন বাণিজ্য উইং খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ২০০৮-০৯ থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছর সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর ব্যবস্থাপনায় বিদেশে ১৯৬টি আন্তর্জাতিক মেলায় অংশগ্রহণ করে। ২০২১ সালে দেশের রপ্তানি ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। শুধু তৈরি পোশাক খাতে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও রপ্তানি পণ্য প্রদর্শনীর জন্য চীনের সহায়তায় মুন্সিগঞ্জ জেলার বাউশিয়াতে প্রায় ৫৩১ একর জমির ওপর ‘বাংলাদেশ চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টার’ নামে একটি অত্যাধুনিক গার্মেন্টস শিল্পপার্ক নির্মাণ প্রক্রিয়া চলছে। ৭৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ ২০১৯ সালের জুন মাসের মধ্যে শেষ হবে।
পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় দেশের শাসনভার গ্রহণ করে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা ক্ষমতায় এসে রাস্তাঘাট, পুল-কালভার্ট নির্মাণ শুরু করি। সবখাতের মতো ব্যবসা খাতের উন্নয়নেও কাজ শুরু করি।
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, দেশের স্বার্থকে বিকিয়ে দিয়ে দেশের খনিজ সম্পদ বিদেশীদের হাতে তুলে দিতে পারেননি বলেই ২০০১ সালের কারসাজির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে পারেনি।
তিনি বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় আসার পর আবারও দেশ পিছিয়ে যায়। ৭ বছর পর আমরা আবার ক্ষমতায় এসে দেশের উন্নয়নের কাজ পুনরারম্ভ করি। ২০০৯ সালে বিশ্বব্যাপী মন্দা ছিল। প্রতিটি ক্ষেত্রে ভয়ভীতি কাজ করতো। সব দূর করে আমরা মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, বিএনজি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে কোনো ব্যবসায়ী ঠিক মতো ব্যবসা করতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে ‘হাওয়া ভবন’ সৃষ্টি করে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পার্সেন্টেজ গ্রহণের অভিযোগেও এ সময় তাদের তীব্র সমালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আর্থ-সামাজিক এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের রোল মডেল। মন্দার প্রভাব সত্ত্বেও বিগত সাড়ে সাত বছরে মাথা পিছু আয় প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৪৬৬ মার্কিন ডলারে হয়েছে। গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪ দশমিক ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হয়েছে। এ সময়ে রপ্তানি আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ১২ দশমিক ৫২ শতাংশ। তিনি বলেন, ইউরোর দরপতন না হলে আমাদের রপ্তানি আয় গত অর্থবছরে ৪০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেত। অব্যাহত রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং প্রবাসী ভাই-বোনদের রেমিটেন্স বৃদ্ধির ফলে আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, এসব সাফল্যের পিছনে আমাদের শিল্প-উদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের কঠোর পরিশ্রম এবং উদ্ভাবনীশক্তি যেমন কাজ করেছে, তেমনি আমাদের সরকারের ব্যবসা-বান্ধব নীতি সহায়ক হিসেবে কাজ করেছে।
ঔষধ রপ্তানিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত সফল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যে আমরা ১২২টি দেশে রপ্তানি করছি। সরকারের বাণিজ্যিক কূটনীতির সাফল্যের কারণে ডব্লিউটিও’র ট্রিপস চুক্তির মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০৩২ সাল পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে। এরফলে ঔষধ রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘৭ম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার টার্গেটসমূহ অর্জিত হলে আমরা এসডিজি’র ৮২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রা সম্পূর্ণরূপে অর্জন করতে সক্ষম হব।’
প্রধানমন্ত্রী আমাদের পাটভিত্তিক বহুমুখী পণ্য, খাদ্যসহ এগ্রো প্রসেসড পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি, আম ইত্যাদির রপ্তানি বৃদ্ধির উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানান।
শ্রমঘন আইসিটি সংশ্লিষ্ট সেবা খাতের রপ্তানি বৃদ্ধির প্রতি তাঁর সরকার জোর দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রপ্তানিকারকদের রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজতর করার লক্ষ্যে এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (ইপিবি)এর অটোমেশন করা হয়েছে। ফলে প্রতি মিনিটে দু’টি করে জিএসপি সার্টিফিকেট ইস্যু করা সম্ভব হচ্ছে। বর্তমানে পৃথিবীর ১৯৮টি দেশে ৭৪৪টি গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানি করা হয়ে থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ন্যাশনাল ট্রেড পোর্টালও চালু করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারের মাধ্যমে দেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠির কর্মসংস্থান ও আয়ের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করছে। দ্রুত পরিবর্তনশীল ও প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থায় টিকে থাকার জন্য রপ্তানি বাণিজ্যসহ বাংলাদেশের সকল অর্থনৈতিক কর্মকা-কে গতিশীল ও বহুমুখী করে তোলার প্রচেস্টা সরকারের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের খন্ড চিত্র তুলে ধরে -২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলায় তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:৪৭ অপরাহ্ণ | আগস্ট ২৮, ২০১৬