|

সর্বশেষ

ময়মনসিংহের ঐহিত্যবাহী ফুটবল ঝিমিয়ে পড়ার নেপথ্যে

 

মতিউল আলম, ৯ আগস্ট ২০১৬, মঙ্গলবার
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ময়মনসিংহ ঝিমিয়ে পড়া ফুটবল অঙ্গনকে একটি ধাক্কা দিয়েছে। ময়মনসিংহ ফুটবলের যে ঐতিহ্য ছিল তা আজ আর নেই। আজ থেকে ৩০- ৩৫ বছর আগের ময়মনসিংহ ছিল ফুটবলের স্বর্ণ যুগ। স’ানীয়ভাবে প্রিমিয়ার লিগ খেলা হলে বাধ ভাঙ্গা মানুষের ঢল নামতো স্টেডিয়ামে। কিন’ জাতীয় পর্যায়ে ফুটবল খেলা হলেও তেমন সারা নেই আগে মতো। শহরের বাঘমারা এলাকার বাসিন্দা ও সংবাদপত্র সেবী মরহুম আঃ সালামের পুত্র কবির উদ্দিন বলেন, আজ ৩০ বছর আগে যে ফুটবল দেখেছি এখন সেই খেলা দেখিনা। বাঘমারার শহীদ স্মৃতি ক্রীড়া চক্র যেদিন খেলা থাকতে সকাল থেকে খেলায় যাওয়ার জন্য প্রস’তি নিতাম। বিকাল হতেই খেলা শুর্বর ১ঘন্টা আগে স্টেডিয়ামে গিয়ে বসে থাকতাম। ঈদের দিনের মতো আবাল বৃদ্ধ বনিতা দল বেধে পায়ে হেটে খেলার মাঠে চলে যেতো। এখন সেই দৃশ্য দেখি না। এখন যুবকরা ফেইসবুক নিয়ে ব্যস্ত। যুবকরা মাদক ও জঙ্গীবাদে জড়িয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ দিয়ে যে ময়মনসিংহবাসী ফুটবল নিয়ে নানাভাবে আলোচনা চলছে। আলোচনা করছে ঐতিহ্যবাহী ফুটবল নিয়ে মাতামাতি থাকলে আজ যুবকরা বিপথগামী হতো না। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এই জেলায় অনেক আগে থেকেই ফুটবল অনেকটা ঝিমিয়ে পড়েছে। এখানে ক্রিকেট আলাদা জায়গা করে নিয়েছে। এই জেলায় জন্ম সাবেক ক্রিকেটার ও বিখ্যাত কোচ রামচাঁদ গোয়ালার। একসময় জাতীয় দলে খেলা ক্রিকেটার সাইফুল ইসলাম, মাহবুবুল আলম সেলিম, সানোয়ার হোসেনরা এই জেলা থেকেই উঠে এসেছেন। বর্তমান জাতীয় দলে খেলছেন মাহমুদউলৱাহ, শুভাগত হোমদের মতো তারকা ক্রিকেটার। উদীয়মান ওপেনার আবদুল মজিদের বাড়িও এই শহরে। ক্রিকেটের শহরে বিপিএলর সুবাদে ফুটবল নিয়ে এই মুহুর্তে আলোচনা সবার মুখে।
এক সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার (জামালপুর) থেকে ঢাকার ফুটবল মাতিয়েছেন সহোদর শামসুল আলম মঞ্জু ও মনোয়ার হোসেন নান্নু। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ও বৃহত্তর ময়মনসিংহেরই (নেত্রকোনা) ফুটবলার।
আশির দশকে ঢাকায় খেলেছেন গোলাম কিবরিয়া বাবুল, শাহ আবদুল হালিম, আবদুল জলিল, হাবিবুর রহমান (ভুলু) আবদুল হাইসহ অনেকে । কিন’ সেই ময়মনসিংহ থেকে এখন আর আলোচিত কোন ফুটবলার নেই। বর্তমানে প্রিমিয়ার লিগে বিজেএমসির হয়ে খেলছেন ময়মনসিংহের একমাত্র ফুটবলার জাকির হোসেন জিকু। তবে ছেলেদের তুলনায় ব্যতিক্রম মেয়েরা। মহিলা ফুটবল দিয়ে সারা দেশে পরিচিতি পেয়েছে ময়মনসিংহ জেলা ধোবাউড়ার প্রত্যন্ত কলসিন্দুর গ্রামের মেয়েরা । এই গ্রামের ১০ ফুটবলার খেলছে জাতীয় দলে। এ্‌র অবদান বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা্‌ মজিব প্রাইমারী স্কুল গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট।
এব্যাপারে ময়মনসিংহ ঐহিত্যবাহী মোহামেডান স্পোটিং ক্লাবের কর্মকর্তা আম্পায়ার ও সাবেক ফুটলার ও ময়মনসিংহ পৌরসভার কমিশনার শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, ময়মনসিংহ ফুটবলের ঐতিহ্য ছিল। আজ আর নেই। ময়মনসিংহ জেলা ক্রীড়া সংস’া সহ ক্লাবগলোতে অপেশাদার কর্মকর্তা ও নেতৃত্বের কারণে আজ এই ঐহিত্য হারিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে ফুটবলে যারা কোচ তারা অশিৰিত বেশী। শিৰিত ও পেশাদার যারা তাদের মুল্যায়ন করা হয়না। স্বাধীনতার ১০ বছর যারা ফুটবল তারকা তারা এখন কোচ। তাদেরকে এখন আর কেই ডাকে না। স’ানীয়ভাবে লিগ খেলার ৪/৫ দিন ক্লাবের কর্মকর্তারা ডোনার কাছ থেকে চাঁদা তোলে সংৰিপ্ত প্রশিৰণ দিয়ে মাঠে নামায়। চাঁদার টাকা অর্ধেক ব্যয় করে বাকীটা পকেটস’ করেন। সৎ কর্মকর্তার খুবই অভাব। আগে স’ানীয় ভাবে অর্থ সংগ্রহ করে ক্লাব চালাতো এখন সেটা নেই। ক্লাবগুলো দলীয় করণের ফলে খেলার প্রতি মনোযোগী কম। ময়মনসিংহ সার্কিট মাঠ ক্রীড়া পলৱী গড়ে উঠেছে। কিন্ত ক্লাবের ফুটবল টিম নেই। এছাড়া নানা অভিযোগ রয়েছে এসব ক্লাবের বির্বদ্ধে। ফুটবলে খেলোয়াড় সৃষ্টি করতে হলে অদৰ, অযোগ্য নেতৃত্বে পরিবর্তন করে পেশাদার দৰ ব্যক্তিদেরকে ক্লাবগুলোতে আনতে হবে। এছাড়া স্কুল ও কলেজ পর্যায় থেকে প্রতিয়োগিতার মাধ্যমে খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে।
২০০৮ সালে জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (ডিএফএ) গঠনের পর মাত্র তিন মৌসুম প্রিমিয়ার লিগের আয়োজন করেছে ময়মনসিংহ ডিএফএ। মোট ১২টি দল অংশ নেয় লিগে। প্রিমিয়ার লিগ অনিয়মিত হলেও আন্ত-উপজেলা টুর্নামেন্ট নিয়মিত আয়োজন করেন বলে দাবি ডিএফএ সভাপতি ওমর হায়াৎ খানের। লিগের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন ময়মনসিংহ পুলিশ দল। ময়মনসিংহে আবাহনী-মোহামেডান থাকলেও সাংগঠনিকভাবে খুবই দুর্বল। শিরোপা লড়াইয়ে থাকে উদয়ন ক্রীড়াচক্র, ফ্রেন্ডস ইলেভেন দল।
ময়মনসিংহে কেন ফুটবল ঝিমিয়ে পড়েছে? ওমর হায়াৎ হতাশার সুরে বললেন, ‘আমাদের এলাকায় সচ্ছল পরিবারের কেউ ফুটবল খেলে না। সবাই ক্রিকেট খেলতে চায়।’ তিনি জানালেন, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে বার্ষিক অনুদান পান ৫-৬ লাখ টাকা। এর বাইরে ফেডারেশনের অনুদান ২ লাখ। কিন’ এত অল্প টাকা দিয়ে নাকি লিগ আয়োজন সম্ভব নয়। ওমর হায়াৎ ময়মনসিংহ শহরে স্পনসর পাওয়া যায় না বলে হতাশা প্রকাশ করেন। কেউ নাকি এ জেলায় খেলাধুলায় আগ্রহ দেখায় না। অথচ বিপিএলের প্রথম দিনে দর্শকসাড়া ছিল তা চোখে পড়ার মতো। অনেকে বলেছেন’ টাকা বড় বিষয় নয়, এখানে কর্মকর্তাদের ইচ্ছার অভাবকে দায়ী করেন । তারা আগে কোন স্পন্সর পাওয়া যেতো না। স’ানীয়রাই পৃষ্টপোশাকতা করতো । তবে এটা সত্য, আগের তুলনায় ময়মনসিংহে ফুটবলচর্চা খুব কম। তার ওপর স’ানীয় প্রিমিয়ার লিগে খেলা ফুটবলারদের ওপর ঢাকার ক্লাবগুলোর নজরদারি নেই। স’ানীয় কোচ মোরসালিন আহমেদ দায়টা নিজেদের কাঁধেও নিয়ে বলেছেন , ‘আমরা সেইভাবে ঢাকার কোচদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি না। এটা আমাদেরই ব্যর্থতা। তা ছাড়া এখানকার বেশির ভাগ কোচই তেমন শিক্ষিত নন। এটাও ফুটবলার বের না হওয়ার অন্যতম একটা কারণ।’ ময়মনসিংহ ক্লাবগলো এখন অধিকাংশ তাস খেলার আড্ডা। ক্রিকেট ছাড়া ফুটবল কোন চর্চা নেই। যোগ্য নেতৃত্ব, নিয়মিত ফুটবল টুর্নামেন্ট, লিগ আয়োজন করা ও উপযুক্ত কোচের মা্‌ধ্যমে প্রশিৰণ দিয়ে খেলোয়াড় তৈরী করতে পারলে আবার চাঙ্গা হতে ময়মনসিংহের ফুটবল অঙ্গন। ###

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:৪০ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০৯, ২০১৬