|

সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ মোকাবেলায় বাংলাদেশ সক্ষম, তা প্রমাণ করেছি : শেখ হাসিনা

 ঢাকা, ১ আগস্ট ২০১৬ (বাসস) : সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীর আরও সহযোগিতা কামনা করে বলেছেন, বাংলাদেশ প্রমাণ করে দিয়েছে সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিদমনে তারা অন্যদের চেয়েও বেশি সক্ষম।
জঙ্গি-সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের ঘটনা পৃথিবীতে প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইউরোপ, ইংল্যান্ড, আমেরিকা-এমন কোন জায়গা নেই যেখানে এমন ঘটনা না ঘটছে। কিন্তুু বাংলাদেশে আমরা এটুকু বলতে পারি যে, ত্বরিত সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন যেখানে যা ঘটছে তা আমরা মোকাবেলা করতে সক্ষম, সেটা আমরা প্রমাণ করেছি।’
যে কোন ধরনের সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বাংলার মানুষ আজকে ঐক্যবদ্ধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অবৈধ ক্ষমতা দখলের, ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ঘৃণা ভরে প্রত্যাখ্যান করেছে এই দেশের মানুষ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ বিকেলে শোকের মাস আগস্টের শুরুতে বঙ্গবন্ধু জাদুঘরের সামনে কৃষক লীগ আয়োজিত স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি পরবর্তী আলোচনা সভায় এ কথা বলেন।
কৃষক লীগের সভাপতি মো. মোতাহার হোসেন মোল্লার সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তৃতা করেন- আওয়মী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, প্রেসিডিয়াম সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. নাসিম, সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আ.ফ.ম বাহউদ্দিন নাছিম, ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস এমপি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কামরুল আহসান খান, কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খন্দকার শামসুল হক রেজা প্রমুখ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন একটা উৎপাত শুরু হয়েছে জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাস। যখনই যে বা যারা এসব কাজে ধরা পড়ছে তাদের যদি গোড়ায় যাওয়া যায় তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, যারা এদেশের স্বাধীনতা বিরোধী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী বা ঐ আলবদর-রাজাকার-তাদেরই এরা সৃষ্ট বা দোসর।
প্রধানমন্ত্রী সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ দমনে দেশবাসীর আরও সহযোগিতা কামনা করে বলেন, ‘দেশবাসীর আরও সতর্কতা দরকার এবং আশেপাশে কোথায় কে আছে সকলের কাছে আমরা এর তথ্য চাই।
তিনি বলেন, বাংলার মাটিতে কোন সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, খুনীদের স্থান হবে না। আর কোন হত্যা ক্যু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আর যেন এই বাংলার মাটিতে না ঘটে। এদেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে আর যেন কেউ ছিনিমিনি খেলতে না পারে। আমাদের পথ কন্টকাকীর্ণ। দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে গেলে পথ সবসময় কন্টকাকীর্ণই হয়। সেই পথ অতিক্রম করেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, আমরা এগিয়ে যাব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই মাস শোকের, শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে বাংলার মানুষের মুখে হাসি ফুটাবার প্রতিজ্ঞা নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছি, দেশের মানুষের দোয়া চাই। আমরা দুই বোন, বাংলার মানুষের দোয়াই আমাদের চলার পথের পাথেয়।
প্রধানমন্ত্রী ৭৫ এর বিয়োগান্তক অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে বলেন, পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট আমার বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নিতে পারেনি, তারাই এ হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। কখনও কল্পনাও করতে পারিনি আমরা দুই বোন সর্বহারা হয়ে যাবো।
তিনি বলেন, বাংলার শোষিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্যে সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার ডাকে সাড়া দিয়ে স্বাধীনতা এনেছিলেন। বিজয় মেনে নিতে পারেনি তারা, এতে সমর্থন দিয়েছিলো তাদেরই কিছু দোসররা। তারাই বাংলার মানুষের কাছ থেকে তাকে কেড়ে নিয়েছিলো।
প্রধানমন্ত্রী স্মৃতি চারণ করে বলেন, যখন ফিরে (১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর) আসি এই বাড়ির সামনের রাস্তায় (ধানমন্ডী-৩২) আমরা মিলাদ করেছি। জিয়াউর রহমানের সরকার তখন আমাকে এই বাড়িতে ঢুকতে দেয় নাই। এই বাড়িতে আমার মা-বাবা জীবন দিয়েছেন, সেই বাড়িতে আমি মিলাদ পড়ব, জিয়াউর রহমান আমাকে এই বাড়িতে মিলাদ পড়তে দেয় নাই। এই রাস্তার ওপর বসে আমাদের মিলাদ পড়তে হয়েছিল, তাও কত বাধা।’
শেখ হাসিনা বলেন, জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছে। এভাবেই হত্যার ষড়যন্ত্র ও খুনিদের মদদ দিয়েছে তারা। জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ ছিলো, তাদের নতুন করে দল গঠন করে রাজনীতির সুযোগ দিয়েছিলো।
তিনি বলেন, ‘হাইকোর্টের রায়ে জিয়া, এরশাদের ক্ষমতা দখল অবৈধ। সেই সময় পরাজিত শ্রেণীর দোসররা বারবার আঘাত হেনেছে। এখনও তাদের উত্তরাধিকারীরাই বারবার আঘাত করছে।’
আজ ১৫ আগস্ট উপলক্ষে রক্তদান কর্মসূচি হচ্ছে। অতীতে যখন এই কর্মসূচি পালন করতে গিয়েছি বার বার বাধার সম্মুখীন হয়েছি-এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর খুনীদের বিচার করতে পেরেছি। ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও এগিয়ে চলেছে। এক একজনের দন্ড কার্যকর হচ্ছে আর বাংলাদেশ একটু একটু করে পাপমুক্ত হচ্ছে। তারপরেও এদের প্রেতাত্মা, সন্তান-সন্তুতি অনেকেই রয়ে গেছে যারা দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখানে একটি কথা আমি বলি, এই বাড়িটা (৩২ নম্বরের) বিএনপি’র আমলে তারা খুলে দেয়নি। কিন্তু, ১২ জুন তরিঘরি করে বাসটা হস্তান্তরে তারা হঠাৎ অস্থির হয়ে পড়ে, এরআগে ৩ মে জিয়াউর রহমান নিহত হয়। যে বাড়িতে এতদিন ঢুকতে দেয়নি হঠাৎ সেটা হস্তান্তরের পেছনে তাদের উদ্দেশ্যে ছিল। চাপ ছিল এই বাড়ি নিতে হলে ৭২ পৃষ্ঠার একটি ইনভেনটরি লিস্ট আমাকে সই করতে হবে। আমার ছোট ফুপা’ তখন বারবার বলছিলেন, আইনজীবীর মাধ্যমেই বাড়িটা নেয়া হবে। কিন্তু, আইনজীবীর মাধ্যমে সে সময় কেন আমাকে দেয়া হয়নি তার কারণটা পড়ে বুঝতে পারি।
তিনি বলেন, এই বাড়িতে সবাইকে হত্যার পর বাড়ি লুটপাট করে পরবর্তীতে সেখানে অবৈধ সম্পদ ঢুকিয়ে মৃত মানুষদের চরিত্র হননের চেষ্টা করে বিএনপি সরকার। ৪০ দিন পর্যন্ত বাড়িতে বিভিন্ন অবৈধ সম্পদ রেখে টিভিতে দেখানো হয়। হিরা-জহরত, গয়নাগাটি অনেক কিছু এই বাড়িতে পাওয়া গেছে আর জিয়াউর রহমান ভাঙ্গা স্যুটকেস আর ছেঁড়া গেঞ্জি রেখে গেছে (মারা যাবার সময়)। তার ছেলে-বউ তাদের জন্য কিচ্ছু রেখে যায় নাই। তারেক কোকোকে ছেঁড়া প্যান্ট পরানো হত, সেগুলো দেখানো হয়। অর্থাৎ ১৫ আগস্ট তারা হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি। পরবর্তীতে মৃত বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের চরিত্র হননের ঘৃণ্য কাজটাও বিএনপি সরকার করেছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাক আমরা সব সময় আল্লাহর ওপরই ভরসা করে ছিলাম। তাদের অপপ্রচার কখনও মানুষ গ্রহণ করেনি। বিএনপি সরকার বঙ্গবন্ধু যে একশ টাকার নোট বাজেয়াপ্ত করেছিলেন সেই নোটও ট্রাংক ভরে এনে এই বাড়িতে রেখে তা দেশবাসীকে দেখানোর চেষ্টা করা হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকে মানুষের কাছে স্পস্ট কে কতটুকু বাংলার মানুষের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছে, কে কতটুকু মানুষের জন্য করতে পেরেছে। বঙ্গবন্ধু তাঁর দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাবার জন্য জেল-জুলুম নির্যাতন সহ্য করেছেন। এই দেশের জন্যই তিনি জীবন দিয়ে গেছেন।
তিনি বলেন, বাংলার গৌরবের ইতিহাস, রক্ত¯œাত মুক্তির সংগ্রামের ইতিহাস, বিজয়ের ইতিহাস- সব ইতিহাসকে মুছে ফেলে দিয়ে একটা মিথ্যা ইতিহাস দিয়ে এদেশের মানুষকে অন্ধ করে রাখার, বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ইতিহাসকে কলুষিত করা হয়েছে। কয়েকটা প্রজন্মকে প্রকৃত সত্য, ইতিহাসকে জানতেই দেয়া হয়নি। অবশেষে ২১ বছর পর আমরা যখন ক্ষমতায় আসি তখনই এদেশের মানুষ সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ আবার প্রচার হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেন, আমাদের লক্ষ্য একটাই এদেশের মানুষের কল্যাণ করা, তাদের মুখে হাসি ফোটানো, তাদের উন্নত জীবন দেয়া।
তিনি বঙ্গবন্ধুর পাশে থাকার স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, বড় সন্তান হিসেবে যেটুকু বাবার কাছে থাকার সুযোগ পেয়েছি দেখেছি তিনি কি করতে চান এদেশের মানুষকে নিয়ে। কিভাবে কল্যাণ করতে চান। আমি চেষ্টা করেছি ঠিক সেইভাবে এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে, দারিদ্যের হার থেকে মুক্তি দিতে, তাঁদের জীবন-মান উন্নত করতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের সমর্থন নিয়েই জনগণের সেবা করার সুযোগ পেয়েছি বলেই আজ তাঁদের কল্যাণে কাজ করতে পেরেছি। মানুষের জীবন মানের পরিবর্তন, কিছুটা হলেও তাঁদের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি আনতে পেরেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এদেশের মানুষের ভাগ্য বদল করেই জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা ইনশাআল্লাহ আমরা গড়ে তুলবো। এটাই আমাদের আজকের দিনের প্রতিজ্ঞা। আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সেই দোয়া করি। ১৫ আগস্ট নিহতদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে তাঁদেরকে আল্লাহ যেন বেহেশতে স্থান করে দেন সেই কামনা করেন।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৫ আগস্ট নিহতদের স্মরণে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:৫৭ অপরাহ্ণ | আগস্ট ০১, ২০১৬