|

সর্বশেষ

বেনাপোল ও পেট্রাপোল সমন্বিত চেকপোস্টের উদ্বোধন করলেন দুই প্রধানমন্ত্রী

 ঢাকা, ২১ জুলাই, ২০১৬ (বাসস) : প্রতিবেশি দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে আজ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একযোগে বেনাপোল ও পেট্রাপোল সমন্বিত চেকপোস্টের উদ্বোধন করেছেন।
বিকেলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে একসঙ্গে সুইচ চেপে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এ দু’টি সমন্বিত চেকপোস্টের উদ্বোধন করেন।
গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লীতে তাঁর কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন।
এ সময় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী কোলকাতায় তাঁর কার্যালয় থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদিকে গণভবনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. আবুল কালাম আজাদ এবং ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রীংলা উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-ভারত আগামীতে আরো গভীর সম্পর্কের মধ্যদিয়ে অর্থনীতিতে মজবুত ভিত্তি রচনা করবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
তিনি বলেনে, ‘দুই দেশের অর্থনীতি আরো মজবুত ভিত্তি পাবে। কারণ, এ দুই দেশের সম্পর্ক মানুষে-মানুষে। এটি সেই ১৯৭১ সাল থেকেই।’
শেখ হাসিনা বলেন, আজ ভারত এবং বাংলাদেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। পারষ্পরিক আদান প্রদানের ক্ষেত্রেও আজকের দিনটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য আমাদের দেশীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে আন্তঃদেশিয় বাণিজ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে টেকসই মজবুত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে উভয় দেশের সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিয়েছে।
দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণে উভয় দেশের সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা সীমান্তে বর্ডার হাট এবং বিভিন্ন ল্যান্ডপোর্ট চালু করেছি। সেগুলো আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, আমাদের মধ্যে সড়কপথ, বাস সার্ভিস, রেলপথ চালু হয়েছে এবং নৌপথতো চালু আছেই। কাজেই এভাবে আমরা দু’দেশের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ট করেছি। আর বিশেষ করে ১৯৭১ সালের কথা সবসময় মনে করি ।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের যে অবদান, সে কথা সবসময় আমরা শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। ভারত সরকার এবং জনগণের এই অবদানের কথা আমরা কখনও ভুলবো না।
শেখ হাসিনা আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, আমরা প্রতিবেশী দেশ, দুই দেশের মধ্যে আমাদের সম্পর্ক সবসময় সুন্দর থাকবে, সৌহার্দ্যপূর্ণ থাকবে এবং যেকোন সমস্যা হলেই আমরা তা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে পারবোÑ যা অতীতেও আমরা করেছি। সেভাবেই দুই দেশের সম্পর্ককে আমরা আরো সুন্দরভাবে গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জির উদ্দেশ্যে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে আমি আন্তরিক অভিনন্দন জানাই, বিশেষ করে তার পুনর্বার নির্বাচনে বিজয়ী হবার জন্য। তাছাড়া আমরা একেবারে কাছের দুটি প্রতিবেশী দেশ। কাজেই আমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে পারষ্পরিক সহযোগিতা বিদ্যমান, তা অব্যাহত থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশ্যে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী এখানে উপস্থিত রয়েছেন। দুই বন্ধুপ্রতিম দেশ আমরা আমাদের দেশের জনগণের কল্যাণের জন্য, জনগণের স্বার্থেই এই যোগাযোগটা একান্তভাবে প্রয়োজন ছিলো। কাজেই ব্যবসা-বাণিজ্যের যত শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে, দেশের মানুষের আর্থ-সমাজিক উন্নয়নও তত ত্বরান্বিত হবে।
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ দমনে পুরো ভারত বাংলাদেশের পাশে আছে বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একা নয়Ñ আপনি নিজেকে একা ভাববেন না। জঙ্গিবাদ দমনে দুই দেশ একইভাবে চলবে।
মোদী অতীতের মতই প্রথমে ভাঙ্গা ভাঙ্গা বাংলায় এবং পরে হিন্দিতে বক্তৃতা করেন।
বক্তব্যের শুরুতে মোদি বলেন, আজ থেকে আমাদের দু’দেশের মধ্যে আদান-প্রদান আরো সহজ হলো। আমরা আরও কাছাকাছি এলাম।
মোদি বলেন, ঢাকার গুলাশানে যে সন্ত্রাসী হামলা হয়েছে তা অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ ঘটনায় নিহত নিরপরাধ ব্যক্তিদের জন্য পুরো ভারতবাসী প্রার্থনা করেছে। এ রকম কঠিন পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনা দৃঢ়ভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
তিনি এ সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের পাশে পুরো ভারত রয়েছে। ভারত সরকার যেকোনো ধরনের সহযোগিতায় আপনাদের পাশে থাকবে।
বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যের বিকাশ বিষয়ে মোদি বলেন, পুরো দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ একটি উন্নত দেশ হতে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এর কান্ডারি।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, ব্যবসা-বাণিজ্যের মধ্যদিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্ব আরো উপরে যাবে। দুই দেশের আরও উন্নতি হবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় এর আধুনিকায়নে তাঁর সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে বলেন, এই বেনাপোল স্থলবন্দরের উন্নয়নে যা যা করণীয় তার সবই তাঁর সরকার করেছে এবং আগামীতেও করে যাবে।
তিনি বলেন, এক সময় এখানে ট্রাক রাখার জায়গা ছিলো না। সেখানে শেড নির্মাণ করা হয়েছে, পার্কিং এবং ট্রানশিপমেন্ট ইয়ার্ড নির্মাণ চলছে এবং পেট্রাপোল আইসিসির সঙ্গে সংযোগ সড়ক সম্প্রসারণের কাজটা আমরা করে দেবো। আরো ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ এবং রাস্তাঘাট মেরামত করে দেয়া হবে। এ সময় এখানে রেল সংযোগ স্থাপনে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়েও তাঁর সরকার পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি জানান।
এই বন্দরের নিরাপত্তার জন্য সরকার আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন করবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি জায়গায় ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন এবং সর্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা হবে। তাছাড়া এখনতো আধুনিক যুগ কাজেই পুরো বন্দরের কার্যক্রম সম্পাদনে অটোমেশন করা হবে। দ্রুত মালামাল লোডিং-আনলোডিংয়ে আমরা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবো।
ভিডিও কনফরেন্সিংয়ে পশ্চিমবঙ্গ থেকে যুক্ত থাকা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তাঁর বক্তৃতায় আজকের দিনটিকে (২১ জুলাই) ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেন।
তিনি অমর একুশে ফেব্রুয়ারি স্মরণ করে বলেন, একুশ শুধু আন্দোলনেরই কথা বলে নাÑ একুশ উন্নয়নের কথাও বলে।
তিনি বলেন, এর আগেও বনগাঁ পেট্রোপোলের মাধ্যমে যে রেল সার্ভিস আমরা চালু করেছিলাম তাতে দুই দেশের সৌহার্দ্য ও সম্পর্ক আরো দৃঢ় হয়েছে এবং আমি মনে করি যে, বনগাঁ পেট্রোপোল সীমান্ত দিয়ে এই যে বড় একটা ল্যান্ডপোর্ট (একশ’ একর জায়গার ওপর নির্মিত) যেখানে ৬৮ হাজার কোটি টাকার ব্যবসা-বাণিজ্য হচ্ছে তাতে পশ্চিমবঙ্গ সরকার সম্ভব সব ধরেনের সহযোগিতা প্রদান করবে। আইন-শৃঙ্খলার বিষয়টি চিন্তা করেই বনগাঁ পুলিশ স্টেশন ছাড়াও আরও একটি পুলিশ স্টেশন সেখানে স্থাপনে তারা উদ্যোগ নিয়েছেন বলেও জানান।
প্রধানমন্ত্রীকে মমতা ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আমাদের ইন্দো-বাংলা সম্পর্ক চিরকালের, চিরদিনের এবং গঙ্গা, যমুনা, তিস্তা, রিস্তা (সম্পর্ক) সমস্ত কিছুর ওপর ডিপেন্ড করেই দুই দেশের সম্পর্ক চিরকালীনÑ চির নবীন ।
এ সময় বেনাপোল পেট্রাপোল বন্দর উদ্বোধনের ফলে দুই দেশের বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের শেষ পর্যায়ে বেনাপোল বন্দরে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে মতবনিময় করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ব্যবসা-বাণিজ্যসহ ভারতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে ইমিগ্রেশন দ্রুত সম্পন্ন করায় এই সমন্বিত চেকপোস্ট ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে সবাইকে এর নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণে সচেষ্ট থাকার আহবান জানান।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যনার্জীকেও আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
তিনি এ সময় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, যারাই মনে মনে যত স্বপ্ন দেখুক যে, জঙ্গিবাদী অপকর্ম করে আমাদের উন্নয়নের গতিকে স্তব্ধ করে দেবেÑ কিন্তুু ইনশাল্লাহ তা পারবে না। কারণ, জনগণের শক্তিই সব থেকে বড় শক্তি। কাজেই জনগণ যখন সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জেগে উঠেছে, ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তখন নিশ্চই আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ধরনের অশুভ শক্তির কবল থেকে আমরা দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে পারবো।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৯:২৮ অপরাহ্ণ | জুলাই ২১, ২০১৬