|

সর্বশেষ

জামালপুরের ৩ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড

 ঢাকা, ১৮ জুলাই, ২০১৬ (বাসস) : মুক্তিযুদ্ধকালীন জামালপরে আলবদর বাহিনীর সংগঠক আশরাফ হোসাইনসহ তিন রাজাকারকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদন্ড দিয়ে আজ রায় ঘোষণা করা হয়েছে। অপর পাঁচ রাজাকারকে আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালেরর চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হকের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল জনাকীর্ণ ট্রাইব্যুনালে আজ এ রায় ঘোষণা করে । বিচারিক প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন-বিচারপতি মো. শাহিনুর ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ সোহরাওয়ার্দী।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে- জামালপুরে আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা আশরাফ হোসাইন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান ও মোহাম্মদ আবদুল বারী। মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত তিন আসামিই পলাতক। আমৃত্যু কারাদন্ডপ্রাপ্তরা হচ্ছে- জামালপুর জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর এডভোকেট শামসুল আলম ওরফে বদর ভাই ও সাবেক জামায়াত নেতা এস এম ইউসুফ আলী, অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মো. হারুন ও মোহাম্মদ আবুল হাসেম। আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট ও মরদেহ গুমের পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে তিনটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ দন্ড দেয়া হয়।
প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ সাংবাদিকদের রায়ের বিষয়ে ব্রিফ করেন। তিনি রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ সময় পর এ বিচারে আসামিদের বিষয়ে সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে অনেক সীমাবদ্ধতা মোকাবেলা করতে হয়েছে। এটা অনেক কষ্টসাধ্য বিষয় ছিল। প্রসিকিউশন নিরলস চেষ্টায় প্রতিটি মামলায় আনীত অভিযোগ প্রমাণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।
আজ রায় ঘোষণা উপলক্ষে ট্রাইব্যুনাল ও আশপাশ এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। আট রাজাকারের বিরুদ্ধে মামলায় ২৮৯ পৃষ্ঠার রায়ের সারসংক্ষেপ ট্রাইব্যুনালে পড়া হয়। ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ারুল হক রায়ের মূল অংশ ঘোষণা করেন। এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত ২৫ তম রায়।
রায়ে বলা হয়, আসামিদের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন আনীত পাঁচ অভিযোগের মধ্যে তিনটিই সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রমাণিত ২ নম্বর অভিযোগে আসামি মো. আশরাফ হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. আব্দুল বারীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়।
একই মামলার আট আসামির মধ্যে গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন এডভোকেট শামসুল আলম ওরফে বদর ভাই ও এস এম ইউসুফ আলী। মুহাম্মদ আশরাফ হোসাইন ছাড়াও পলাতক অন্য আসামিরা হলেন- অধ্যাপক শরীফ আহমেদ ওরফে শরীফ হোসেন, মোহাম্মদ আবদুল মান্নান, মোহাম্মদ আবদুল বারী, মো. হারুন ও মোহাম্মদ আবুল হাসেম।
রায় শোনাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালের এজলাসকক্ষে আসামির কাঠগড়ায় হাজির করা হয় এ মামলায় গ্রেফতারকৃত দুই আসামি এডভোকেট শামসুল আলম ওরফে বদর ভাই ও এস এম ইউসুফ আলীকে।
গত ১৯ জুন উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় রায় ঘোষণা অপেক্ষমান (সিএভি) রাখে ট্রাইব্যুনাল।
গত বছরের ২৬ অক্টোবর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, আটক, অপহরণ, নির্যাতন, লুটপাট ও মরদেহ গুমের পাঁচটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ২৫ জন সাক্ষ্য দেন।
আসামিদের মধ্যে গ্রেফতার দু’জন মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বাহিনীর সদস্য ছিল। পলাতক বাকি ছয়জন ছিল আলবদর বাহিনীর। গ্রেফতারকৃত এডভোকেট শামসুল আলম জামালপুর জেলা জামায়াতের আমীর ছিল এবং এস এম ইউসুফ আলী সাবেক জামায়াত নেতা ও সিংহজানি স্কুলের সাবেক প্রধান শিক্ষক।
মামলাটির প্রধান আসামি পলাতক আশরাফ আলবদর বাহিনীর জামালপুর মহকুমা কমান্ডার ছিল। তার মাধ্যমেই মূলত ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা কর্মীদের নিয়ে জামালপুরে মুক্তিযুদ্ধে কিলিং স্কোয়াড আলবদর বাহিনী গঠিত হয়। পলাতক অধ্যাপক শরীফ আহম্মেদ স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক এবং বাংলাদেশ পাবলিকেশন্স লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে কর্মরত ছিল।
গত বছরের ৩ মার্চ আসামীদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ওই দিনই জামালপুর থেকে শামসুল হক ও ইউসুফ আলীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গত বছরের ২২ জুলাই পলাতক আসামিদের আত্মসমর্পণের জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়া হলেও তারা আত্মসমর্পণ করে নি।
আট আসামির বিরুদ্ধে পাঁচ অভিযোগ: প্রথম অভিযোগ: মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও শান্তি কমিটির সদস্য এডভোকেট শামসুল হক ও এস এম ইউসুফ আলী ও তাদের অন্য সহযোগীরা তৎকালীন জামালপুর মহকুমায় সাধারণ মানুষকে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা ও অগ্নিসংযোগের মত মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে। শান্তি কমিটির পরামর্শ ও নির্দেশনায় পাক হানাদার বাহিনী ও স্থানীয় আল-বদর বাহিনী দুই আসামির অংশগ্রহণ ও সহযোগিতায় ১৯৭১ এর ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত জামালপুরে গণহত্যা চালায়। ওই সময় তারা স্বাধীনতাকামী এক হাজার লোককে হত্যা করে। এ ঘটনায় শামসুল হক ও ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়।
দ্বিতীয় অভিযোগ: আসামি আশরাফ হোসেন, শরীফ আহমেদ, আব্দুল মান্নান, হারুন ও আব্দুল বারী মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই এবং ২২ জুলাই জামালপুরের সরিষাবাড়ী থানার মইষ ভাদুরিয়া ও ধূপদহ গ্রামের শহীদ আব্দুল হামিদ মোক্তারের বাড়ি, মো. সাইদুর রহমান ভূঁইয়ার বাড়ি, আমির আলী খানের বাড়ি, পিটিআই হোস্টেলের টর্চার ক্যাম্প ও জামালপুর শ্মশানঘাটে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে। এ ঘটনায় শরীফ হোসেন, মো. আশরাফ হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. আব্দুল বারী ও হারুনের বিরুদ্ধে অপহরণ, নির্যাতন, হত্যা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ আনা হয়।
তৃতীয় অভিযোগ: মুক্তিযুদ্ধকালীন ১০ জুলাই আসামি শরীফ আহমেদ, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী, আবুল হাসেম, শামসুল হক, ইউসুফ আলী ও স্থানীয় আল-বদর বাহিনী ও শান্তি কমিটির সদস্যরা জামালপুরের সিঅ্যান্ডবি রোডের (পুরাতন) দয়াময়ী লেনের মল্লিক ভিলা থেকে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন শহীদ নুরুল আমীনকে অপহরণ করে। তারপর ওইদিন সকাল ১০টায় তার মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদের চ্যাপতলা ঘাটে ভেসে ওঠে। এ ঘটনায় শরীফ হোসেন, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী,আবুল হাশেম, শামসুল হক, ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে অপহরণ ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
চতুর্থ অভিযোগ: জামালপুরে আশরাফ হোসেনের নেতৃত্বে বদর বাহিনী গঠিত হয় । তখন সে সময় জামালপুর মহকুমার ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিল। জামালপুরের আশেক মাহমুদ ডিগ্রি কলেজকে সে সময় নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হত, যার প্রধান ছিল আশরাফ হোসেন। আসামি শরীফ আহমেদ, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারীসহ অন্যদেরও সেখানে নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসামিরা সেখানে অনেককে আটকে রেখে নির্যাতন ও হত্যা করেছে। এ ঘটনায় আশরাফ হোসেন, শরীফ হোসেন, আব্দুল মান্নান ও আব্দুল বারীর বিরুদ্ধে আটকে রিখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়।
পঞ্চম অভিযোগ: মুক্তিযুদ্ধকালীন ২২ এপ্রিল থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত আসামি শরীফ আহমেদ, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী, আবুল হাসেম, শামসুল হক ও ইউসুফ আলী এবং স্থানীয় আল বদর বাহিনীর সদস্য ও পাক হানাদাররা জামালপুরের পিটিআই হোস্টেলকে নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। সেখানে নিরস্ত্র মানুষকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হত এবং রাতে তাদের ব্রহ্মপত্র নদের তীরে শ্মশান ঘাটে নিয়ে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেয়া হত। আসামি শরীফ হোসেন, আশরাফ হোসেন, আব্দুল মান্নান, আব্দুল বারী, আবুল হাশেম, শামসুল হক, ইউসুফ আলীর বিরুদ্ধে আটকে রিখে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৮:০৭ অপরাহ্ণ | জুলাই ১৮, ২০১৬