|

গুলশান হামলার আগেই কিশোরগঞ্জে যায় জঙ্গিরা

21858_f2
আশরাফুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ থেকে | ১১ জুলাই ২০১৬, সোমবার |

গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে পহেলা জুলাই রাতে সন্ত্রাসী হামলায় রক্তাক্ত হয় রাজধানীর ডিপ্লোম্যাটিক জোন। এ ঘটনা ঘটার আগেই হামলার টার্গেট করা হয় শোলাকিয়ার বৃহত্তম ঈদ জামাতকে। টার্গেট সফল করার মিশন নিয়ে পহেলা জুলাই দুপুরেই কিশোরগঞ্জে এসে বাসা ভাড়া নেয় ছাত্র পরিচয়ে এক জঙ্গি। পরে তার সঙ্গে এসে যোগ দেয় আরো চার জন। জেলা শহরের নীলগঞ্জ রোড এলাকার ৪৩২ হোল্ডিংয়ের ‘পরশমণি’ নামের নির্মাণাধীন বহুতল ভবনটির নিচতলার পশ্চিম পাশের ইউনিটে বসেই হামলার ছক তৈরি করা হয়। ঈদগাহ ময়দান থেকে ১৫ মিনিটের মতো পায়ে হাঁটা দূরত্বের এই বাসা থেকেই দফায় দফায় রেকি করা হয়। ঈদের দিন সকালে পাঁচজনের দলটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে বেরিয়ে পড়ে অপারেশনে। হামলায় নেতৃত্ব দেয়া নিহত জঙ্গি আবির রহমান ও র‌্যাবের হাতে আটক জঙ্গি শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলাম ওরফে সাইফুল ইসলামকে পেছন থেকে অনুসরণ করে অপর তিনজন। কিন্তু তল্লাশি চৌকিতে পুলিশের তৎপরতা নস্যাত করে দেয় তাদের সব পরিকল্পনা। তল্লাশির মুখে পড়ে চাপাতি ও বোমা নিয়ে পুলিশের ওপর হামলে পড়ে জঙ্গি আবির ও শরীফুল। ‘পরশমনি’ নামের ওই বাসাটির মালিক মো. আবদুস সাত্তার নামের অবসরপ্রাপ্ত এক খাদ্য নিয়ন্ত্রক। বাড়িওয়ালা মো. আবদুস সাত্তারের একমাত্র ছেলে সারোয়ার জাহান সায়েম নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। র‌্যাব-১৪ এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শরীফুল ইসলাম জানান, কিশোরগঞ্জের নীলগঞ্জ রোডের বাসাতেই পাঁচ জঙ্গি আস্তানা গাড়ে। ছাত্র পরিচয়ে জয়নাল আবেদীন ওরফে আকাশ ছদ্মনামের এক জঙ্গি বাসাটির একটি ইউনিট ভাড়া নেয়। চারজনের থাকার কথা বলে বাসাটি ভাড়া করা হলেও পরে বাসাটিতে তারা পাঁচজন অবস্থান করে। ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য যেসব জিনিসপত্র না হলেই নয়, সেসব জিনিসপত্র তারা বাসাটিতে নেয়। হামলার সময় ঘটনাস্থলে গুলিবিদ্ধ র‌্যাবের হাতে আটক জঙ্গিকে ওই বাসায় কী কী রেখে এসেছো জিজ্ঞেস করলে সে জানায়, রান্নার কড়াই, বাসনপত্র, চারটি বালিশ, তিনটি কম্বল ও কিছু বইপত্র। আটক জঙ্গির দেয়া তথ্য অনুযায়ী ওই বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে জঙ্গির বর্ণনা মতো জিনিসপত্র পাওয়া যায়। ওই বাসায় গিয়ে তিনটি কম্বল পাতানো অবস্থায় এবং চারটি বালিশের প্রত্যেকটি বালিশ কভার ছাড়া অবস্থায় পাওয়া যায়। সেখান থেকে সেসব বইপত্র উদ্ধার করা হয় সেগুলো কোন জিহাদি বইপত্র নয়, সাধারণ পাঠ্যপুস্তক। ঈদের দিন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে দুজনের একটি গ্রুপ প্রথমে বাসা থেকে বের হয়। পরে তাদের অনুসরণ করে বাকি তিনজনের গ্রুপটি। শনিবার বিকালে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইন্সে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিবাদে আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় আইজিপি একেএম শহীদুল হক শোলাকিয়ায় হামলাকারীদের মধ্যে তিন জঙ্গি আগে থেকে স্থানীয় একটি বাসায় ভাড়া নিয়ে অবস্থান করছিল বলে উল্লেখ করেন। আইজিপি বলেন, হামলাকারীরা গুরুদয়াল সরকারি কলেজের ছাত্র হিসেবে পরিচয় দিয়ে বাসাটি ভাড়া নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, শোলাকিয়া মাঠে হামলা চালিয়ে বিশ্বে তাদের শক্তি জানান দেয়া। কিন্ত আমাদের চৌকস পুলিশের কারণে তারা সফল হতে পারেনি।  আইজিপি আরো বলেন, সন্ত্রাস নির্মূলে পুলিশের পাশাপাশি ওলামায়ে কেরাম এবং সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা প্রয়োজন। দেশে যত হামলার ঘটনা ঘটেছে সব ঘটনা উদঘাটন করতে পুলিশ সক্ষম হয়েছে। মনে রাখতে হবে, মহান স্বাধীনতা সংগ্রামে এই পুলিশই সর্ব প্রথম জীবন দিয়ে পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।

রোববার দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে নিচতলার পশ্চিম পাশের ইউনিটটি তালাবদ্ধ ও ক্রাইম সিনের টেপ আটকা অবস্থায় পাওয়া যায়। সংলগ্ন পূর্বপাশের ইউনিটটির ভাড়াটিয়া জেলার তাড়াইল উপজেলার আকুবপুর গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. দিদারুল ইসলাম জানান, ২০১৪ সালের মার্চ মাস থেকে তিনি এই বাসাটিতে সপরিবারে বসবাস করছেন। দুই কক্ষের এই ইউনিটটির মাসিক ভাড়া ছয় হাজার টাকা। মাঝের ইউনিটটিতে একজন এনজিও কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে ভাড়া আছেন। এছাড়া পশ্চিমপাশের ইউনিটটি জুলাইয়ের এক তারিখ খালি হয়। মো. দিদারুল ইসলাম জানান, ঈদের আগের দিন সপরিবারে তিনি ঈদ পালনের জন্য গ্রামে গিয়েছিলেন। আজই (রোববার) দুপুরে তিনি বাসায় ফিরেছেন। তবে নতুন ভাড়াটিয়া কারা উঠেছে তা তার পরিবারের লোকজন জানেন না। এছাড়া নতুন ভাড়াটিয়া আসলে সেসব আসবাবপত্র নিয়ে আসা হয়, সেরকম কোনো আসবাবপত্র আনতেও তারা কাউকে দেখেননি। তিনি জানান, এই বাসার মালিক মো. আবদুস সাত্তার। তিনি বাসার দোতলার পূর্বপাশের ইউনিটটিতে বসবাস করেন। দোতলায় গিয়ে কথা হয় বাসার মালিক মো. আবদুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সামসুন্নাহারের সঙ্গে। মো. আবদুস সাত্তার জানান, তিনি নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে ২০১০ সালের জুন মাসে অবসর নেন। তার গ্রামের বাড়ি জেলার কটিয়াদী উপজেলার সহস্রাম ধূলদিয়া ইউনিয়নের রায়খলা গ্রামে। তার বাবার নাম মৃত আফতাব উদ্দিন। মো. আবদুস সাত্তারের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তিন সন্তানের মধ্যে বড় মেয়ে দিলরুবা আক্তার সদরের নীলগঞ্জ হাজী মোমতাজউদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলার প্রভাষক, আরেক মেয়ে দিলারা আক্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে স্নাতকোত্তর করে প্রকৌশলী স্বামীর সঙ্গে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় বসবাস করেন এবং সবার ছোট একমাত্র ছেলে সারোয়ার জাহান সায়েম আলোচিত ‘নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। সারোয়ার জাহান সায়েম রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার একটি বাসা ভাড়া নিয়ে সেখানে থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন বলেও মো. আবদুস সাত্তার জানান। বাসা ভাড়া দেয়ার প্রসঙ্গে মো. আবদুস সাত্তার ও তার স্ত্রী সামসুন্নাহার বলেন, বাসার সামনে টু-লেট টানানো দেখে পহেলা জুলাই দুপুরে এক তরুণ নিজেকে কিশোরগঞ্জ সরকারি গুরুদয়াল কলেজের অর্থনীতি বিষয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র পরিচয় দিয়ে খালি ইউনিটটি ভাড়া নেয়ার কথা বলে।
এ সময় তার নাম জয়নাল আবেদীন এবং তার বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার আসিমপুর বাজার বলে জানায়। তার বাবা আসিমপুর বাজারে ধান-চালের স্টক ব্যবসা করে। বাসা ভাড়া নিয়ে একই কলেজে ইংরেজিতে অনার্স প্রথম বর্ষের দুইজন এবং অর্থনীতিতে অনার্স প্রথম বর্ষের দুইজন ছাত্র থাকার কথা বলে। সে অনুযায়ী মাসিক ছয় হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে সে দুই হাজার টাকা অগ্রিম হিসেবে দেয়। পরদিন ২রা জুলাই দুপুরে সে পিঠে ঝুলানো একটি ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে বাসায় ওঠে। চারজন বাসায় থাকার কথা বললেও জয়নাল আবেদীন নামের এই ছেলেটিকে ছাড়া আর কাউকে তারা এই কয়দিনে একবারও দেখেননি। এ প্রসঙ্গে মো. আবদুস সাত্তার জানান, গত ৩রা জুলাই রাতে তার চাচা অছরউদ্দিন মারা যান। তার দাফনের কাজে পরদিন ৪ঠা জুলাই সকালে তিনি সপরিবারে গ্রামের বাড়ি রায়খলায় চলে যান। এই কারণে পরবর্তীতে কারা ওই বাসায় উঠেছে, তাদের সম্পর্কে আর কোনো খোঁজ নিতে পারেননি। ৫ই জুলাই তিনি বাসায় নিজের কক্ষে থেকে কথিত জয়নাল আবেদীনকে তার মোবাইল নাম্বারে (০১৮৩৩৬১৪৬৯৮) ফোন করলে সে বলে, আমরা শোলাকিয়ায় ঈদ করবো। ঈদ করে বাড়ি চলে যাবো। ঈদের দিন সকালে গৃহকর্ত্রী সামসুন্নাহার তাদের জন্য সেমাই ও পিঠা তৈরি করে দিলে গৃহকর্তা মো. আবদুস সাত্তার সেগুলো নিয়ে নিচতলায় সিঁড়ি লাগোয়া তাদের কক্ষের দরজার সামনে যান। দরজায় নক করার পর জয়নাল আবেদীন দরজা খুলে সামনে থেকেই সেমাই ও পিঠা নেয়। পরে শোলাকিয়া থেকে নামাজ পড়ে আর বাসায় ফিরবে না জানিয়ে জয়নাল ভাড়াটিয়া আবদুস সাত্তারের হাতে চাবি বুঝিয়ে দেয়। ঈদের পরদিন এসে বাসায় ওঠবে বলেও এ সময় জয়নাল জানায়। পরে ঈদের দিন রাতে র‌্যাব এই বাসায় এসে আবদুস সাত্তারকে নিয়ে বাসা তল্লাশি করে। এ সময় সেখান থেকে পাওয়া কিছু বইপত্র র‌্যাব নিয়ে যায়। এছাড়া আবদুস সাত্তার ও তার ছেলে সারোয়ার জাহান সায়েমকে র‌্যাব কিশোরগঞ্জ ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তাদের ছেড়ে দেয়। এই ঘটনাটিকে তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা হিসেবেও মন্তব্য করেন খাদ্য বিভাগের সাবেক এই কর্মকর্তা। তার ছেলে সায়েম এখন কোথায় আছে এই প্রশ্নের উত্তরে মো. আবদুস সাত্তার বলেন, সায়েম এখন বাসাতেই আছে। এদিকে র‌্যাবের হাতে আটক জঙ্গি ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব-১৪ এর কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শরীফুল ইসলাম। তিনি বলেন, জয়নাল আবেদীন ওরফে আকাশ ছাত্র পরিচয়ে বাসাটি ভাড়া নেয়। হামলার ঘটনায় স্থানীয়দের সম্পৃক্ততার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রথমে কথা বলে হামলার ঘটনার সঙ্গে বাসার মালিক ও তার ছেলের কোনো সংযোগ আছে মনে হয়নি। তবে এখন বিষয়টি উড়িয়ে দিচ্ছি না। অন্যদিকে আলোচিত ‘পরশমনি’ নামের এই বাসাটি থেকে আলামত সংগ্রহের জন্য গতকাল সকালে সিআইডির একটি বিশেষ টিম কিশোরগঞ্জে আসে।
দুই জঙ্গির বিরুদ্ধে থানায় মামলা
শোলাকিয়া ঈদগাহের প্রবেশপথে পুলিশ চেকপোস্টে হামলা ও হতাহতের ঘটনায় মামলা হয়েছে। গতকাল দুপুরে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় মামলাটি রেকর্ড করা হয়। চেকপোস্টে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ পরিদর্শক ও পাকুন্দিয়া থানার ওসি (তদন্ত) মো. সামসুদ্দীন বাদী হয়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯/ সংশোধনী ২০১৩ এর ৬(২)/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় র‌্যাবের হাতে আটক শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলাম ওরফে সাইফুল ইসলাম (২২) ও পুলিশের হাতে আটক জাহিদুল হক তানিম (২৪) এই দুইজনের নামোল্লেখসহ আরো কিছু অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারনামীয় দুই আসামির মধ্যে শরীফুল ইসলাম ওরফে শফিউল ইসলাম ওরফে সাইফুল ইসলাম দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার রাণীগঞ্জ বাজার এলাকার আবদুল হাই-এর ছেলে এবং জাহিদুল হক তানিম কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের পশ্চিম তারাপাশা মনিপুরঘাট এলাকার মো. আবদুস সাত্তারের ছেলে। মামলায় সন্ত্রাসী-জঙ্গির কাজে উদ্বুদ্ধ হয়ে ষড়যন্ত্র, সহায়তা ও প্ররোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে সুপরিকল্পিতভাবে আগ্নেয়াস্ত্র, বিস্ফোরকদ্রব্য ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে পুলিশ ও জনগণের ওপর আক্রমণ করে নৃশংসভাবে পুলিশ ও সাধারণ নাগরিককে হত্যা ও জখম করার অভিযোগ আনা হয়। কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোর্শেদ জামানকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। গতকাল বিকালে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি মীর মোশারফ হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়েরের বিষয়টি সাংবাদিকদের জানান। এদিকে হিমঘরে পড়ে রয়েছে শোলাকিয়া হামলায় নেতৃত্ব দেয়া পুলিশের গুলিতে নিহত জঙ্গি আবির রহমানের লাশ।
কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, সন্ত্রাস ও সহিংস উগ্রপন্থা দমনে বাংলাদেশের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষজ্ঞ সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ঢাকা সফররত মার্কিন সহকারী মন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল গতকাল পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেন। বৈঠক শেষে মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতি এবং পররাষ্ট্র সচিবের ব্রিফিংয়ে বিষয়টি খোলাসা করা হয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় কাছাকাছি সময়ে উগ্রপন্থিদের বড় ধরনের আক্রমণের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জাপান, ভারত, রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থা দমনে আরো ঘনিষ্ঠভাবে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় কাঠামোতে এসব দেশ বাংলাদেশকে সহায়তা দিতে চায়। কোন দেশ থেকে কি ধরনের সহায়তা দিলে বাংলাদেশ বেশি উপকৃত হবে সরকারের নীতিনির্ধারকরা এখন তা-ই পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে। সূত্র মতে, গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তরাঁয় ১লা জুলাইয়ের হামলা-পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা সহায়তার বিষয়ে আলোচনার জন্য নিশা দেশাই গতকাল জরুরি ভিত্তিতে ঢাকায় আসেন। সফরের প্রথম দিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী এবং সচিব মো. শহীদুল হকের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় দীর্ঘ বৈঠক করেন তিনি। সেখানে দেশি-বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার বিষয়ে আলোচনা ছাড়াও গুলশান আক্রমণের ঘটনা তদন্তে মার্কিন কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা-এফবিআই’র সম্পৃক্ততা নিয়ে কথা হয়। আজ এ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভীর সঙ্গে মার্কিন সহকারী মন্ত্রীর আলোচনা হওয়ার সূচি নির্ধারিত রয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবনের বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, সন্ত্রাসবাদ দমনে সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। সেখানে নিশা আমাদের দেশের সামপ্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে সহানুভূতি জানিয়েছেন। তারা বাংলাদেশের পাশে রয়েছেন এবং আগামী দিনেও তাদের সহায়তার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সন্ত্রাস ও উগ্রপন্থা দমনে যুক্তরাষ্ট্র অতীতেও বাংলাদেশকে কারিগরি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা দিয়েছে উল্লেখ করে সচিব বলেন, এই সহায়তা বর্তমানে কিভাবে আরো গভীর করা যায় তা নিয়ে আমাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। চলমান সমস্যা কিভাবে মোকাবিলা করতে পারি তা নিয়েও আমরা আলোচনা করেছি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় প্রশিক্ষণ সহায়তাসহ নতুন আর কি করা যায় সে বিষয়ে ঢাকার মনোযোগ ছিল বলে জানান সচিব। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, আমরা যে কোনো দেশের সহযোগিতা নিতে প্রস্তুত। তবে সেই সহযোগিতার মডালিটিজ কি হবে? তা নিয়ে আমাদের আলোচনা চলছে। মার্কিন সহকারী মন্ত্রীর সফরের বিষয়ে সচিব বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেছেন নিশা দেশাই বিসওয়াল। আগামীকাল (আজ) সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তার সাক্ষাৎ হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও তার সাক্ষাতের সম্ভাবনা রয়েছে। ওই সব কর্মসূচির পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনার বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট হবে বলে আশা করেন পররাষ্ট্র সচিব। এদিকে পদ্মায় পররাষ্ট্র মন্ত্রী ও সচিবের সঙ্গে বৈঠক শেষ হওয়ার পর মার্কিন দূতাবাসের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়- দুটি বৈঠকে নিশা দেশাই বলেছেন, ‘আমাদের এই দুটি  দেশকেই সন্ত্রাসবাদের বৈশ্বিক হুমকি  মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবো।’ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে সামপ্রতিক সন্ত্রাসী হামলায় ভুক্তভোগীদের জন্য সমবেদনা জানান নিশা। তিনি বলেন, ‘আমাদের বাংলাদেশি অংশীদারদের সঙ্গে আমরা  শোক ভাগ করে নিয়েছি। বাংলাদেশের প্রতি আমাদের অঙ্গীকার সব সময়ের মতোই অটুট থাকবে।’ সাক্ষাতের সময় নিশা দেশাইয়ের সঙ্গে ছিলেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, এবং নিশার সফরসঙ্গী দেশটির দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক উপ-সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানপ্রিত সিং আনন্দ।
কূটনীতিক ও নাগরিক সমাজের সঙ্গে বৈঠক আজ: এদিকে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, আজ সকালে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতঃরাশ বৈঠকে বসছেন মার্কিন সহকারী মন্ত্রী নিশা  দেশাই বিসওয়াল। ওই বৈঠকের পর ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন তিনি। সেখানে পূর্ব-পশ্চিম ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরা উপস্থিত থাকছেন বলে জানা গেছে।
গত মে মাসের পর মার্কিন সহকারী মন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালের এটি দ্বিতীয় ঢাকা সফর। গত এপ্রিলে রাজধানীর কলাবাগানে নিজ বাসায় মার্কিন মিশনের কর্মকর্তা জুলহাজ মান্নান ও তার বন্ধু মাহবুব তনয় নিহত হওয়ার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় ঢাকায় এসেছিলেন তিনি। তার সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায়ের ৪টি টিম ঢাকা সফর করে। সেই সময়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার প্রস্তাব দেয়া হয়। এখানে থাকা মার্কিন কূটনীতিক, তাদের মিশন ও স্টাফদের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করার বিষয়েও আলোচনা করেন তারা। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গুলশানে রেস্তরাঁয় ইতিহাসের ন্যক্কারজনক জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে। যেখানে ১৮ জন বিদেশি নাগরিকসহ ২২টি নিরীহ প্রাণ ঝরে যায়। অবশ্য যৌথবাহিনীর সাঁড়াশি অভিযানে ৬ জঙ্গি নিহত এবং ১ জনকে আটক করা সম্ভব হয়। উদভূত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে উগ্রপন্থিদের নির্মূলে আন্তর্জাতিক কমিউনিটি ঢাকাকে আরো ঘনিষ্ঠ সহায়তার প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফোন করে সহানুভূতি জানান। এখানে সন্ত্রাস নির্মূলে সব ধরনের সহায়তা দিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তুতির বিষয়টি ব্যক্ত করেন তিনি।
বিশেষ প্রতিনিধি জানান, ঢাকাস্থ পাঁচ স্থাপনায় বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী র‌্যাব বা বিজিবি মোতায়েন চেয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। এছাড়া গুলশান ও বারিধারা এলাকায় বসবাসরত দূতাবাস কর্মকর্তা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের সহকারী হাইকমিশনের অফিস এবং ভারতীয় ভিসা আবেদন গ্রহণ সেন্টারের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা চাওয়া হয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজানে ঘটনার পর নিরাপত্তা চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে এ সংক্রান্ত একটি নোট ভারবাল পাঠিয়েছে ভারতীয় হাইকমিশন। ওই নোট ভারবালে হলি আর্টিজান বেকারিতে সাম্প্রতিক ঘটনা এবং তাদের সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যের প্রেক্ষিতে ভারতীয় হাইকমিশন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিশেষ নিরাপত্তা দেয়ার অনুরোধ জানায়। এছাড়াও ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের বাসভবনে যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। একই অনুরোধ জানানো হয়েছে চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর সহকারী হাইকমিশন এবং কর্মকর্তাদের বাসভবন, ১১টি ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে। এছাড়া ভারতীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং এদেশে বসবাসরত ভারতীয়দের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছে হাইকমিশন। এদিকে ঢাকাস্থ ফ্রান্স দূতাবাস ও কোরিয়ান দূতাবাস প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা চেয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাদা দুটি নোট ভারবাল পাঠিয়েছে। ফ্রান্স দূতাবাস তাদের নোট ভারবালে ফ্রান্স অ্যাম্বাসি (গুলশান ২ নম্বরের ১০৮ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাড়ি) এবং রেসিডেন্স অফ ফ্রান্স (হাউজ ৭, রোড ৯৯, গুলশান-২) এ অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের অনুরোধ করা হয়েছে। কোরিয়ান দূতাবাস তাদের নোট ভারবালে কোরিয়ান কমিউনিটির জন্য নিরাপত্তা জোরদারের অনুরোধ জানিয়েছে। কয়েকটি কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের তালিকা দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের সামনে দুইজন সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েনের জন্য বলেছে। এর মধ্যে ঢাকায় তাদের প্রতিষ্ঠান ১০টি ও চট্টগ্রামে চারটি। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রেস্টুরেন্টের সংখ্যাই বেশি।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ৭:২৬ অপরাহ্ণ | জুলাই ১১, ২০১৬