|

যাকাত-রদবদল এবং আলো-আঁধার-

রহিম আব্দুর রহিম, ১২ জুলাই ২০১৫, রবিবার,

সম্প্রতি ‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’ ময়মনসিংহে যাকাত নিতে গিয়ে ২৭ জনের মৃত্যু, অন্যটি আগস্টে মন্ত্রী পরিষদে রদবদল। পত্রিকার এই দুইটি খবরে সারাদেশে তুমুল সমালোচনা-আলোচনার ঝড় উঠেছে। যাকাতের কাপড় আনতে গিয়ে ময়মনসিংহে মারা গিয়েছে ২৭ জন, আহত ২০ জন, পদদলিত হয়েছে শতাধিক। ময়মনসিংহের নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরীর মালিক শামিম তালুকদার, প্রতি বছরই যাকাত দিয়ে থাকেন। এই বছরও তিনি যাকাত দেবেন বলে ৬’শ হত দরিদ্রদের মাঝে সিস্নপ বিতরণ করেছিলেন। কিন’ যাকাত প্রদানের মুহুর্তে কয়েক হাজার লোক তার ফ্যাক্টরীতে ভিড় জমায়। বিভিন্ন পত্র পত্রিকার সংবাদের সার সংড়্গেপে ধারণা করা হচ্ছে, ঘটনার দিন অতিরিক্ত মানুষের হুড়োহুড়িতে পড়ে এ ধরনের নির্মম হত্যাকান্ড ঘটেছে। ঘটনায় রাষ্ট্রপতি মো. আব্দুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পীকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, বিএনপি চেয়ারপারর্সন বেগম খালেদা জিয়া, জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ শোক প্রকাশ করেছেন। ঘটনার রহস্য উৎঘাটনে দুটি তদনত্ম টিম গঠন করা হয়েছে। যাকাত দাতা নূরানী জর্দা ফ্যাক্টরীর মালিক শামিম তালুকদারসহ ৮জনকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।

মর্মানিত্মক এই দুঃজনক ঘটনার জন্য দায়ীকে কে বা কারা? তা আমার পড়্গে বলা সম্ভব নয়। তবে, যাকাতদাতা শামীম তালুকদারের দু’টি উদ্দেশ্য ষ্পষ্ট, তার একটি দরিদ্রদের মাঝে কাপড় বিতরণ যা মহৎ এবং মহান। দ্বিতীয়টি, নিজের এবং ফ্যাক্টরীর নাম জাহেরী করা। ভালো কাজ করতে গিয়ে তাকে হতে হচ্ছে খুনি। এজন্য আসলে দায়ি কে? কষ্ট হয়! শামীম তালুকদারের মত নাম জাহেরীকারীরাই ইসলামের ড়্গতি করছে। বর্তমান পরিসি’তিতে, বাংলাদেশের এমন কোন জেলা শহর নেই যেখানকার মানুষরা ঈদের কাপড় ক্রয় করতে পারবে না। অথচ ময়মনসিংহে কয়েক হাজার মানুষ! যাকাতের কাপড় নিতে যাওয়া হাজারো মানুষের ভীড় পড়েছিল ভোর বেলায়। প্রশ্ন , শামীম তালুকদার স্নীপ বিতরণ করলেন ৬’শ, লোক হাজির হলেন কয়েক হাজার, কেন এমটি হলো? যাকাত দাতা কেন স’ানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয় না করে এ ধরনের মহান কাজটি করতে গেলেন? তার উদ্দেশ্য যদি, সত্যিকার অর্থেই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হতো, তবে তিনি স’ানীয় জেলা প্রশাসক কিংবা পুলিশ প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করতেন। কারণ, ইসলাম কখনো বিশৃঙ্খলা, অশানিত্ম সমর্থন করে না। শামীম তালুকদার যাকাত প্রদানে বিশৃঙ্খলা করেছে। এড়্গেত্রে রাষ্ট্রের দায়িত্ব যে নেই একথা হলফ করে বলা যাচ্ছে না। কারণ, অনেক বারই আমরা এধরনের ঘটনার খবর শুনেছি। তবে কেন? রাষ্ট্র যাকাত প্রদানে বিশৃঙ্খলা কিংবা দুর্ঘটনা ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় নীতিমালা প্রণয়ন করছে না। ময়মনসিংহের এই ঘটনাকে সামনে রেখে আমাদের ভাবা উচিৎ, ঘটনা দুঃখ জনক, নির্মম তবে যাকাতদাতার উদ্দেশ্য মহৎ কি না? বারবার এ ধরনের ঘটনা থেকে জাতিকে রড়্গা করতে সুশৃঙ্খল একটি নীতিমালা সরকারের থাকা প্রয়োজন আছে কিনা? এড়্গেত্রে ২০ বা ২৫ এর অধিক ব্যক্তিদের মাঝে অতি গোপনে যাকাত প্রদানকারী ব্যতিত, প্রকাশ্যে যাকাত দাতারা স’ানীয় প্রশাসনের কোষাগারে যাকাত প্রদান করতে পারে কিনা? যা কি-না স’ানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে বিতরণ হবে। তবে, যাকাতদাতার কোন তালিকা থাকলে, তা প্রশাসন গুরম্নত্ব সহকারে বিবেচনা করবে। ময়মনসিংহের মর্মানিত্মক এই মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যাকাত দাতা, যাকাত গ্রহীতাদের যেমন শিড়্গা নেওয়া উচিৎ তেমনি রাষ্ট্রের সতর্ক হওয়া অনিবার্য।

‘টক অব দ্যা কান্ট্রি’র দ্বিতীয় সংবাদ শিরোনাম ‘আগস্টে মন্ত্রী পরিষদের রদবদল?’ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবর অনুযায়ী দুর্নীতিবাজ, বিতর্কিত এবং নিষ্ক্রিয় মন্ত্রীরা, মন্ত্রী পরিষদ থেকে বাদ পড়ছে বলে আমরা জানতে পারছি। এধরনের সংবাদ পাঠে সাধারণ আওয়ামীলীগ দরদীদের মাঝে স্বসিত্মর আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তবে সাংবাদিকদের সংবাদ অনুযায়ী, মন্ত্রী পরিষদে আসতে পারেন এমন যাদের নাম উলেস্নখ করা হয়েছে, তাতে আবার হতাশাও দেখা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দেশ সুচারম্নভাবে পরিচালনার জন্য যে নিরনত্মর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন এমন ধারণাও সাধারণরা করছেন। তারা মনে করছেন, ‘লংকায় যে যাচ্ছে সেই রাবন সাজছে।’ এড়্গেত্রে সাধারণের মতামত ; এবার যদি রদবদল হয়, তবে সৎ, কর্মঠ এমন নতুন মুখ মন্ত্রী পরিষদে আসবে এমনটি কামনা করছেন। প্রধানমন্ত্রী কাকে মন্ত্রীত্ব দেবেন, কাকে সরাবেন এটা একানত্মই তাঁর ব্যাপার। মন্ত্রী পরিষদ রদবদল সরকারের রম্নটিন ওয়ার্ক। এখানে হতাশা, বদনাম, ভাবমূর্তি নষ্ট কিংবা উজ্জল হওয়ার কিছুই নেই। তবে পরিবর্তন আসুক নতুনদের জন্য এটাই সবার কাম্য।

মূল প্রসঙ্গ আলো-আঁধার, ৬৮ বছরের অবরম্নদ্ধ ছিটমহলবাসীর দীর্ঘদিনের মানবিক আবেদন বাসত্মবাযনে বাংলাদেশ ও ভারত সরকারের সকল প্রক্রিয়া শেষের দিকে। দীর্ঘদিনের অন্ধকার জগতের মানুষরা চলতি জুলাই মাসের ৩১ তারিখ আনুষ্ঠানিকভাবে আলোর মুখ দেখবে। কিন’ এই আলোর মাঝেও আঁধারের ঘনঘটার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ছিটমহলগুলোতে চলছে যৌথ হেড কাউন্টিং। বাংলাদেশের অভ্যনত্মরে ভারতের ১১১টি এবং ভারতের অভ্যনত্মরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের জনমানুষ নানা হতাশা আতঙ্কে রয়েছে। এখনও প্রতারিত হচ্ছে প্রতারকদের কাছে। ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পর ছিটমহলবাসীদের পূর্বের নিয়মকানুন অনুযায়ী জমি বন্দোবসত্ম বা ক্রয়-বিক্রয় করেছে, তা কি ঠিক থাকবে কিনা? জমি রেজিস্টার হবে কি না? ২০১১ সালের হেড কাউন্টিং অনুযায়ী বর্তমানে বিনিময় কাউন্টিং হচ্ছে, অথচ ওই সময়ে যারা কাউন্টিং এর বাইরে ছিল তাদের কি নাগরিকত্ব দেওয়া হবে কি না? এবং যারা বাংলাদেশের নাগরিক এবং বর্তমানে ছিটমহলে তালিকাভুক্ত হচ্ছে তাদের দ্বৈত বিষয়টি সুরাহা হবে কিনা? ছিটের অধিবাসী থাকাকালে তাদের তৈয়ারকৃত ভলিউমগুলো কোন কাজে আসবে কিনা? কিংবা বিভিন্ন সময় ড়্গতিগ্রস’ কাগজপত্র পাওয়ার কোন উপায় আছে কিনা? তারা এগুলো জানার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করছে। তাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর ছিটমহল এলাকাগুলো যখন কোন দেশের নাগরিকত্ব পাবে তখন ওই এলাকার জনগোষ্ঠীর জন্য জনপ্রতিনিধি হিসেবে কারা কাজ করবেন তাদের গড়া পূর্বের ছিট চেয়ারম্যান নাকি নতুন করে কোন স’ানীয় জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা হবে? অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, সুবিধাবাদী এক শ্রেণির প্রতারকরা সহজ সরল ছিটবাসীদের মাঝে গুজব ছড়িয়েছে ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পর, যারা ২০১১ সালে তালিকাভূক্ত হয়েছে, তারা নাকি বড় অঙ্কের সরকারি প্যাকেজ পাবে। আর যারা হয়নি তারা এই প্যাকেজ থেকে বঞ্চিত হবে। আর প্যাকেজ প্রদানের অজুহাতে গোপনে চলছে নানা ধরনের প্রতারণা। সবচেয়ে দুঃখজনক ঘটনা, ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পূর্বেই বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার দহলা খাগড়াবাড়ি ছিটে আলহাজ্ব লুৎফর রহমান নামের এক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছে। যার প্রতিষ্ঠাতা বাংলাদেশে অভ্যনত্মরে থাকা এক ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা। যারা স্কুল প্রতিষ্ঠা করেই নিয়োগ দেওয়ার নাম করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। এই মুহুর্তে দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় সুবিধাবঞ্চিত মানুষরা আর যেন কোনভাবেই কারো কাছে প্রতারিত কিংবা নির্যাতিত না হতে পারে সেই ড়্গেত্রে বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের উচ্চ পর্যায়ের হসত্মড়্গেপ জরম্নরী হয়ে পড়েছে।

লেখকঃ শিক্ষক, শিশু-সংগঠক নাট্যকার

সর্বশেষ আপডেটঃ ৩:৩৫ অপরাহ্ণ | জুলাই ১২, ২০১৫