|

নেত্রকোনার ঐতিহ্য “গয়ানাথের বালিশ”

বিশেষ প্রতিনিধি :  রসিকতা করে মানুষ বলে  “জাম গোল্লা পেয়ে শ্বশুর করল চটে নালিশ, ইচ্ছে ছিল আনবে জামাই গয়ানাথের বালিশ।” আবার কেইবা বলেন “দিনে খাওয়া যায়, আর রাতে শিথানে দেয়া যায়” এর নাম বালিশ। এই বালিশ সেই বালিশ নয়- এটি হচ্ছে নেত্রকোনার গয়ানাথের বালিশ।
নেত্রকোনার ঐতিহ্যবাহী বালিশ মিস্টির নাম বালিশ। গয়ানাথের বালিশ বললে সবাই চিনে। যুগযুগ ধরে ধরে রেখেছে তার ঐতিহ্য। কালের সাক্ষি হয়ে আছে নেত্রকোনার বালিশ মিস্টি। বালিশ মিস্টি দেখতে অনেকটা কোল বালিশের ন্যায়। জেলার গন্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা এমনকি দেশের বাইরেও এর সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। সুদূর আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা ও সৌদি আরবেও এ মিস্টির নাম ছড়িয়ে আছে।
নেত্রকোনায় বেড়াতে আসলে রসনাতৃপ্তির জন্য সবাই চিন্তা করেন বালিশ মিস্টির কথা। কেউ খেয়ে যান আবার যাবার সময় সাথে করে প্যাকেটে করে নিয়েও যান প্রিয়জনদের জন্য। আশপাশের জেলা এমনকি প্রবাসীরা প্রবাসে কর্মস’লে ফিরে যাওয়ার সময় নিয়ে যান গয়ানাথের বালিশ।
জানা গেছে, প্রায় ১১০ বছর আগে জেলা শহরের বারহাট্টা রোডে গয়ানাথ মিস্টান্ন ভান্ডারের স্বত্বাধিকারী গয়ানাথ ঘোষ নামে এক ব্যক্তি এ মিস্টি প্রথম তৈরী করেন। বারহাট্টা রোডে তার ছিল ছোট্ট মিস্টির দোকান। গয়ানাথ ঘোষ দুধ দিয়ে অনেক ধরনের মিস্টি বানাতেন। এসব মিস্টি কমবেশি সব দোকানিই বানাতে পারত। গয়ানাথ ঘোষ চিন-া করলেন নতুন কিছু করার। সে চিন-া থেকেই দুধের ছানা দিয়ে পরীক্ষা করে মিস্টির কাঠামো তৈরী করলেন। যার আকৃতি দেখতে অন্য মিস্টির চাইতে অনেকটা বড় এবং অনেকটা কোল বালিশের মতো দেখতে। দু’একজনকে দেখালেন এবং খাওয়ালেন। মানুষ তখন মিস্টির নাম জানতে চায়। নাম নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়েন তিনি। পরিবারের লোজনের সাথে আলোচনা করেও নাম ঠিক করতে পালেননা। শেষে চেহারার সাথে মিল রেখে নাম দিলেন বালিশ মিস্টি। আসে- আসে- গয়ানাথের বালিশ নামে পরিচিতি পেল ওই মিস্টি। সেই থেকে আজ পর্যন্ত দেশ বিদেশে তারি ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।
গয়ানাথ ঘোষ দেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই ১৯৬৯ সালে ভারতে চলে যান। চলে যাওয়ার সময় তার সহযোগি নিখিল চন্দ্র মোদক এই মিস্টি তৈরীর দায়িত্ব নেন। জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি বালিশ মিস্টি তৈরীর ধারা অব্যাহত রাখেন। নিখিল চন্দ্র মোদকের মৃত্যুর পর তার তিন ছেলে বাবুল চন্দ্র মোদক, খোকন চন্দ্র মোদক ও মোদক ব্যবসা পরিচালনা করছেন। আজও তারা বালিশ মিস্টি তৈরী করে অতিথ ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছেন। পুরোনো সেই ছোট্ট দোকান এখন অনেক বড় দোকান হয়েছে। মিস্টি বিক্রি করে তাদের বব্যসার প্রসারতা বেড়েছে। বারহাট্টা রোড ছাড়াও জেলা শহরের স্টেশন রোডে আরও একটি মিস্টির দোকান দিয়েছেন। বারহাট্টা রোডে রয়েছে বালিশ মিস্টি তৈরীর নিজস্ব কারখানা। ওই কারখানায় বালিশ মিস্টির পাশাপাশি অন্য মিস্টিও তৈরী করা হয়। মেছুয়া বাজারেও দোকান নেয়ার চিন্তা করছেন তারা। গয়ানাথের বালিশের সুনাম ও জনপ্রিয়তা দেখে জেলা শহরের অন্য দু’একটি মিস্টির দোকানিও বালিশ তৈরী করে থাকে। তবে গয়ানাথের ন্যায় তারা খ্যাতি লাভ করতে পারছেননা।
গয়ানাথের বালিশ এতটাই জনপ্রিয় যে, প্রয়াত নন্দিত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাসে এ সম্পর্কে লিখা হয়েছে। এ ছাড়া কবি নির্মলেন্দু গুনের লেখনিতে তার নাম উঠেছে। স্থানীয় কবি সাহিত্যিকরা বালিশ মিস্টিকে নিয়ে ছড়া কবিতা লিখে থাকেন।
কারিগর রতন জানান, বালিশ মিস্টি তৈরীর মূল উপাদান দুধ, চিনি ও ময়দা। প্রথমে দুধ থেকে তৈরী করা হয় ছানা, ছানা ও ময়দা দিয়ে মন্ড, আর মন্ড দিয়ে বানানো হয় বালিশ। সবশেষে চিনির রসে ভাজা হয় বালিশ। এ ছাড়া তৈরীর সময় বালিশকে মূখরোচক করতে প্রয়োগ করা হয় বিশেষ কলাকৌশল। ব্যবসায়িক স্বার্থে সে সব গোপন কথা জানাতে রাজি নন দোকান মালিক বাবুল চন্দ্র মোদক। পরিবেশনের আগে বালিশের ওপরে এক ধরনের সুস্বাদু ঘন ক্ষীরের (দুধের মালাই) প্রলেপ দেয়া হয়। প্রথমে ছোট ও বড় দুই সাইজের বালিশ তৈরী করা হতো। দাম ছিল ১০টাকা ও ২০টাকা। ৫০টাকা দামের মিস্টি অর্ডার দিয়ে বানাতে হতো। এখন বিক্রি হয় ২০টাকা ও ৫০টাকা করে। প্রায় এক কেজি ওজনের একটি মিস্টি ২০০ টাকা এবং আধা কেজি ওজনের এক পিস মিস্টি একশ টাকায় বিক্রি বিক্রি হয়। যা বিশেষ করে অর্ডার দিয়ে বানাতে হয়। স্বাভাবিক তাপমাত্রায় গরমের সময় বালিশ তিন দিন এবং শীতের সময় সাতদিন পর্যন- এমনিতেই ভালো থাকে।
বাবুল চন্দ্র মোদক বলেন, গাভীর খাঁটি দুধ ছাড়া বালি বানানো হলে প্রকৃত স্বাদ পাওয়া যায়না। আমরা স’ানীয় বেপারীদের কাছ থেকে দুধ কিনে থাকি। আামাদের অন্য কোন স’ানে শাখা নেই। সঠিক মান ধরে রাখার জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছি। বালিশ তৈরীর জন্য দু’জন কারিগর নিয়মিত কাজ করে। প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে অনেক মানুষ আসে বালিশ নেয়ার জন্য। ভোর থেকে মধ্য রাত পর্যন- বালিশ বাননোর কাজ চলে।

এ সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সর্বশেষ আপডেটঃ ১০:৩৬ অপরাহ্ণ | মে ০২, ২০১৫